কলাপাতা রঙের শাড়ী ২য় এবং শেষ পর্ব




 কলাপাতা রঙের শাড়ী

 ২য় এবং শেষ পর্ব 

শুভ শাড়ী আর মেহেদী তাদের পড়াশোনা শেষ করে বলল  ,,

--- আগামীকাল দেখা হচ্ছে তবে মহারাণী। ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থেকো। এরপর তো আমার দায়িত্ব তোমাকে ভালো রাখার।

এই বলে শুভ দরজার দিকে পা বাড়াতেই আবার পিছনে ফিরে এসে বললো,,,

--- আর হ্যাঁ শাড়ী পরিয়ে দিয়েছি। এখন চুপচাপ এখানে বসে থাকবে। একদম নড়াচড়ার দরকার নেই। না-হয় বিয়ের আগেরদিন পা ভেঙে আবার আমাকে কোলে করে নিয়ে যেতে হবে। 

--- হুহ। পা না ভাঙলেও কোলে করেই নিয়ে যেতে হবে। 

--- আমার কি লজ্জাশরম নেই নাকি?

---ওরে আমার লজ্জাবতী রে..  । ওপ্স তুমি তো একটা ছেলে তাই না। এতোই লজ্জা থাকলে আজকে না আসলেও পারতে ।

--- হইছে। এখন চুপচাপ এখানে বসে থাকো। আগেরবার শাড়ী পরে যে পড়ে গিয়ে বাম পায়ের আঙুল কেটেছিলে মনে আছে?  নেহাত শাড়ী পরতে চেয়েছিলে নাহলে 

---- হইছে বকবক না করে যাও।

--- আচ্ছা। আল্লাহ্ হাফেজ বউ। 

--- আল্লাহ্ হাফেজ।

*******

--- তরু, এই তরু

--- হু

--- তুমি বারেন্দায় দাঁড়িয়ে কি করছো, বলোতো। 

--- কি করবো রুমে অন্ধকার। তুমি নাকি আলো জ্বালাতে নিষেধ করেছো। তাই তোমার বোনরা আমাকে অন্ধকারে বসিয়ে চলে গেছে। 

---- বারেন্দাটার দিকে নজর দিয়েছো?

---- হু। একদম আমার মনের মতো। দুটো চেয়ার। ফুল গাছ। 

--- হু। চোখ বন্ধ করো এবার। 

--- কেন? 

--- প্রশ্ন করোনা। চুপচাপ রুমে আসো।

শুভ আমার চোখ ধরে রুমে নিয়ে আসে। শুভ লাইট জ্বালিয়ে আমাকে চোখ খুলতে বললো। আমি চোখ খুলেই অবাক। একদম আমার পছন্দ মতো সব।

 শুভ একদমই বই পড়েনা। অথচ শুধু আমার জন্যই পুরো একটা বুকসেল্ফ ভর্তি বই। আমার পছন্দের কালারের বেডশিট। পুরো রুমজুড়ে টেডি বিয়ার, ফুলদানি।  

কিন্তু ড্রেসিং টেবিলটা অদ্ভুত। কোনো আয়না নেই। আমি শুভর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,,,

--- শুভ ড্রেসিং টেবলে কোনো আয়না নেই ক্যান?

শুভ আমার চুল একপাশে সরিয়ে দিয়ে বলল,,,

--- এটা আমার বউয়ের জন্য স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানানো। এখানে বসে চোখে কাজল লাগাবে আর আমার চোখে আয়না দেখবে। 

আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম,,,

--- আমি বুঝতে পেরেছি শুভ তুমি কেনো কোনো আয়না রাখোনি। যাতে এই ভয়ংকর বিভৎস চেহারা যাতে না দেখা যায়। 

শুভ পুড়ে যাওয়া কপালে চুমু দিয়ে বললো..।

--- একদম তাই নয়। আর কে বলেছে ভয়ংকর?  আমি তো এক রাজকন্যাকে আমার ঘরের রাণী বানিয়েছি। যে আমার কাছে পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দরী নারী।

তুমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে   আয়না দেখবে আর আমি তোমার চোখে। 

শুভ আমার সব কথা রেখেছে দেখে ভেবেছিলাম আলমারি ভর্তি শাড়ী রেখেছে নিশ্চয়ই৷ তাই আলমারির কাছে যেতেই শুভ বলে উঠলো,,,

---- সব শাড়ী পুড়িয়ে ফেলেছি সেদিন। আমি চাইনা আর কোনো শাড়ির ছোঁয়া লাগুক। যেই শাড়ী তোমাকে একটা বছর যন্ত্রণা দিয়েছে সেই শাড়ী আশেপাশেও থাকুক আমি চাইনা।

---- শুভ দোষ তো আমার। আমি যদি সেদিন তোমার কথা শুনে চুপচাপ বসে থাকতাম। তাহলে হয়তো আজকের এই দিন আমাদের দেখা লাগতো না। আই এম স্যরি শুভ।  আই এম স্যরি।

এই বলে কাঁদতে থাকি। 

শুভ আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,,,,

--- কিচ্ছু হয়নি। সামান্য ব্যাপার। 

শুভ হয়তো আমার মনের জোর বাড়াচ্ছে কিংবা তার ভালোবাসার জোর। তবে আমি তো জানি সেই একটা ঘটনায় আমি আমার চেহারাটাই হারিয়েছি। 

সেদিন শুভ বারবার করে নিষেধ করা সত্ত্বেও আমি শাড়ী পরে বের হয়েছিলাম৷ চা করে দেওয়ার কথা বলার জন্য কিচেনে যাই। চাচী আম্মা পানি ফুটিয়ে নিচে রেখেছিল।।

কিভাবে যেন শাড়ীতে আমার পা টা আটকে আমি ফুটন্ত পানিগুলোতেই পড়ে যাই ৷ 

---- আউউউউউউউউউউউউ

---- কি হয়েছে তরু? কি হলো তোমার?

--- ক ক কই কিছুনা তো।

--- তুমি সেদিনের ঘটনাটা আবার ভাবছো তরু? তুমি শুনবে না আমার কথা? 

--- আমি তো ভুলতে পারছি না শুভ। সেই দিনের সেই বিভৎস যন্ত্রণার কথা আমার বারবার মনে পড়ে।তবে একটা কথা কি জানো তো সেদিনের সে ঘটনাটা না ঘটলে বুঝতেই পারতাম না কেউ কাউকে এতোটা ভালোবাসতে পারে। গত একটা বছরের তোমার সব মুহুর্ত নষ্ট করে দিয়েছি আমি। কাব্য পেইজ 

--- আর একটা কথা বললে ঠাস করে একটা লাগিয়ে দিবো। তুমি জানো না প্রিয় মানুষের পাশে থেকে তার প্রতিটা কষ্টের সাক্ষি হওয়া কতটা সুখের। কিন্তু আফসোস তোমার কষ্টের ভাগ নিতে পারিনি।

---- বিশ্বাস করো শুভ আমার একটুও কষ্ট হয়নি। বরং প্রতি সেকেন্ড তোমার ভালোবাসা উপভোগ করেছি। নতুন তোমাকে চিনেছি। 

--- হইছে আমাকে আর এতো ফুলাতে হবেনা । ফ্রেশ হও আগে আগে তুমি । আলমারিতে দেখ জামা রাখা আছে। 

--- শুভ

---- হু কিছু বলবে?

আমি আমার মাথা নিচু করে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে লাগলাম ,,, 

---- এখন আর বুঝি আমাকে কাজলে ভাল্লাগবে না?

--- হঠাৎ এই কথা ক্যান?

---- সব কথা মনে রেখেছো ঠিকি অথচ আমি যে  আমাকে কাজল পরিয়ে দিতে বলেছিলাম সেটা কি মনে আছে তেমার..? 

--- গাধী। কাজল পরিয়ে দেওয়ার আগে যে সাদা শাড়ী পরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল সেটা মনে আছে?

--- কিন্তু শাড়ী তো সব পুড়িয়ে দিয়েছো।

--- উঁহু মহারাণী। একটা শাড়ী তো রেখেছি। 

ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে শুভ আমাকে শাড়ী পরিয়ে দিচ্ছে ঠিক সেই এক বছর আগের মতো। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে আজও তাকিয়ে আছি। ভালোবাসা জমানোর কোনো ব্যাংক নেই তারপরও মুনাফার হারে বাড়ছে শুভর ভালোবাসা। 

শুভ শাড়ী পরিয়ে দিয়ে বললো,,,,

---  আমার চোখের দিকে একটু তাকাও তো । নিজেকে কেমন লাগছে দেখো একটু ।

আমি শুভর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,,,

-  চোখের ভালোবাসা যার সুন্দর,  যেখানে সৌন্দর্য এসে ভীড় করে সেখানে কি করে আমাকে অসুন্দর দেখায় বলো ? 

শুভ তার বাহুডোরে বেঁধে নিয়ে আমাকে বললো,,,

---- আমার ভালোবাসাটা তো সম্পূর্ণ তুমি। যদি আমার ভালোবাসা সুন্দর হয় তাহলে তো সেই ভালোবাসার সৌন্দর্য তুমি।

__কলাপাতা রঙের শাড়ী__

 সৌন্দর্য  পর্ব--- ২(শেষ পর্ব)

4 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন