≈ গল্পঃ #আমাদের_সংসার ≈
পর্ব - [ ০৪ ] #সমাপ্ত
কিছু সময় পর নীরা রাতের খাবার খেতে ডাক দিলো। রাতের খাবার খেয়ে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। নীরাও এসে পাশে শুয়ে পড়লো দুজনের মাঝে সে রাতে আর কোন কথা হলো না। সকালে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে বের হলাম। দিয়ার সাথে দেখা করার জন্য। যেখানে দেখা করার কথা সেখানে চলে গেলাম, অপেক্ষা করতে শুরু করলাম দিয়ার আসার। আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি আগেই চলে এসেছি, সময় মত দিয়াও চলে আসলো।
আমাকে দেখে দৌড়ে আমার বুকে ছুটে আসলো, ও আমার বুকে মাথা রাখতেই আমার সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল। সাথে সাথেই দিয়াকে ধাক্কা দিয়ে বুক থেকে সরিয়ে দিলাম।
দিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
- 'এটা কি হলো, আর তুমি এভাবে আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো কেন সিয়াম?'
আমি বললাম,
- 'সেদিন পরীক্ষা কেমন দিয়েছো?'
- 'হুম ভাল হয়েছে।'
মেজাজটা পুরাই গরম হয়ে গেল, আমার সামনে এসেও দিয়া কিভাবে মিথ্যা কথাটা বলছে।আমার ধৈর্য্য আর কুলোয় না, আমি বললাম,
- তুমি এতো মিথ্যা বলো কিভাবে বলতো আমাকে ? ত পরীক্ষা কি তার বুকে বসে আর ঠোঁটে লিখে দিয়েছিলে? নাকি...
আরও কিছু বলতে পারলাম না আর নিজের বিবেকের কাছেই বাঁধছিল। দিয়া তবুও অস্বীকার করে বলে,
- 'এগুলা তুমি কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলো তুমি।
আমি ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিয়ে বললাম,
- 'আমি মিথ্যা বলছি? সে দিন বনানী তুই যাসনি? একটা ছেলের সাথে দেখা করিসনি।'
দিয়া বলে উঠলো,
- 'হ্যাঁ করেছি তো কি হয়েছে, তোমার যদি ভাল না লাগে চলে যাও আর কখনো আমি তোমার সাথে যোগাযোগ করবো না। তোমার মত কতশত ছেলে আমার পেছনে ঘুরে।'
কথাটা শুনে ইচ্ছে করছিল এখুনি ওর গলাটা টিপে ধরি, কিন্তু পারলাম না। নিজেকে অনেক ছোট মনে হচ্ছিল আমার কাছে। আমি ওকে আর কিছু না বলে ওখান থেকে চলে আসলাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল, ভেবে ছিলাম হয়তো ও সত্যিটা বলবে। তখন সব ভু্লে আমি ওকে ক্ষমা করে দিবো। কিন্তু ও যা বললো তারপর আর ওর সাথে থাকা বা ক্ষমা করার প্রশ্নই উঠে না। মনের ভিতর মেয়েদের প্রতি আরও ঘৃণার জন্ম নিলো। রাগে জ্বলতে জ্বলতে বাসায় চলে আসলাম।
বাসায় এসে রুমে বসতেই নীরা এক গ্লাস শরবত নিয়ে এসে দিলো। তারপর পাশে বসে বললো,
- 'সমস্যার সমাধান হয়েছে আপনাদের?'
আমি কোন কথা বললাম না। নীরার দিকে চেয়ে দেখি চোখ দুটো লাল বর্ণ হয়ে আছে। নীরা বললো,
- 'আমি কিছু দিনের জন্য বাবার বাড়ি যাবো। যদি দিয়ে আসতেন ভাল হতো।'
আমি বললাম,
- 'ঠিক আছে তুমি রেডি হয়ে তাক আমি গিয়ে তোমাকে বিকেলে দিয়ে আসবো।
সেদিন বিকেলে নীরাকে তার বাবার বাড়িতে দিয়ে আসি। আর এদিকে বিদেশ যাওয়ার জন্য আমি প্রস্তুতি নিতে থাকি।
অল্প কিছু দিনের ভিতর বিদেশে যাবার সব ব্যবস্থা হয়ে যায়।
যাবার আগে বাবা, মা বলেন নীরাকে বাড়িতে নিয়ে আসতে।আমি যে দিন চলে যাবো তার আগের দিন নীরাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি।
পরদিন আমার ফ্লাইট রাত সাড়ে এগারোটায়, নয়টার সময় বাসা থেকে বের হয়ে যাবো। নীরার সাথে এর মাঝে আমার খুব একটা কথা হতো না।
সবার কাছ থেকে আমি বিদায় নিয়ে নিলাম, বাড়ি থেকে বের হবার আগে নীরার কাছে গেলাম বিদায় নিতে। ওর প্রতি সব চেয়ে বেশী অন্যায় করেছি আমি। তবুও শেষ বারের মত বিদায় তো আমাকে নিতেই হবে। নীরা বারান্দার গ্রীলটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল, আমি যেতেই ও চোখের পানি মুছার ব্যর্থ চেষ্টা করলো।
তারপর মুখে একটা মলিন হাসি ফুটিয়ে বললো,
- 'আর কি আমাদের দেখা হবে?'
কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠলো, কিন্তু কোন উত্তরই আমি নীরাকে দিতে পারলাম না। এর কোনো উত্তর সেদিন আমার কাছে ছিল না। কারণ আমি যে নিয়ত করেছিলাম আর বাংলাদেশে আসবো না।
নীরা আমার নিরবতা দেখে বললো,
-আপনি হয়তো কোন একদিন বাংলাদেশে আসবেন কিন্তু সে দিনটা হয়তো অনেক দেরী করে পেলবেন।
আমি নীরার কথায় সেদিন ভেবেছিলাম হয়তো আমি চলে যাবার পর ও বাবার বাড়ি চলে যাবে কিংবা নতুন করে কাউকে বিয়ে করে সংসার করবে তাই মনে মনে একটু হেসে ছিলাম। আর কোন কথা না বলে আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম তার চোখের জল সেদিন আমায় আটকাতে পারেনি।
আমি বিদেশের মাটিতে যেয়ে সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে কাটিয়ে দিলাম জীবন থেকে পাঁচটি বছর।
সবাইকে সংসারকে ভুলে যাবার জন্য, ক্লাব পার্টি, এমন কোন কিছু বাদ ছিলোনা যা আমি করি নাই। কিন্তু পাঁচ বছরে সে সব করে ক্লান্ত হয়ে আমি বুঝতে পারি। আমি আর পারছি না ভালোবাসার টানে, একটা সুখের সংসারের আশায় আমি আবারও ফিরে আসি বাংলাদেশে।
'
কলিং বেল চাপতেই ছোট একটা বাচ্চা মেয়ে দরজাটা খুলে দেয়। চোখ দুটো ঠিক নীরার মত।
কোলে তুলে নিয়ে বলি,
- 'মামুনি তোমার নাম কি?'
মেয়েটা একটা হাসি দিয়ে বললো,
- 'আমার নাম মায়া।'
ততক্ষণে বাবা, মা চলে আসলো। বাবা, মা আমাকে দেখে কান্না করে দিলো। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললাম,
- 'বাবা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি অনেক ভুল করেছি।'
বাবা বললেন,
- তুই এসেছিস তাতেই আমি খুশি শান্তি মত মরতে পারবো।'
আমি বলি,
- 'বাবা এই সব কি বলো! মা নীরা কোথায়?'
মা কোন কথা না বলে চুপ করে রইলো। মায়ের চুপ করে থাকাটায় আমার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো তবে কি সত্যিই নীরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো।
মাকে বললাম,
- 'মা এই মেয়ে কে?'
মা চুপ করে ঘরের দিকে চলে গেলো। আমি মায়াকে নিয়ে আমার ঘরে যেতেই মা একটা ডায়েরী এনে হাতে দিয়ে বললো,
- 'তোর সাথে যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। নীরা তোর জন্য এই ডায়েরীটা রেখে গেছে'
বলে মা রুম থেকে চলে গেলেন। আমি ডায়েরীটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। সেখানে চিঠির মত সব লেখে রেখেছে নীরা।
ডায়েরীতে লেখা ছিলো -
❝❝
সিয়াম আপনি চলে যেয়ে আর আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখেননি বাড়ির কারোর সাথে, তাই কথা গুলো আমি এখানে লিখে রাখছি যদি কখনো ফিরে আসেন আর আমাকে না পান তবে এই ডায়েরী আমার না বলা কথা গুলো বলে দিবে। 💔 আপনার সাথে আমার এক মাস সতেরো দিনের ছোট একটা সংসার ছিলো, তাকে হয়তো আমাদের সংসার বলা যায় না। শুধুই আমার সংসার বলা যায়, তবে যদি কখনো ফিরে আসেন, এবং এক সাথে সংসার করি তবে সেটা হবে আমাদের সংসার।
≈ আপনি চলে যাবার একমাস পর আমি অনুভব করি আমার মাঝে অন্যকারো অস্তিত্বের। কোন মেয়ের জীবনে এর চেয়ে আনন্দের আর কোন মুহূর্ত থাকতে পারে না। কিন্তু আমার জন্য তা আনন্দের হলো না, কারণ আপনিতো আমার পাশে নেই। প্রতিটা মেয়েই হয়তো চায় তার স্বামীকে এই খবরটা প্রথম দিতে কিন্তু আমি অভাগী তা পারলাম না।কারণ আপনিতো কখনো আমাকে মন থেকে মেনে নেননি আর কোন যোগাযোগও রাখেন নি।
≈ দেখতে দেখতে আমার পেটে বড় হয়ে উঠছে আপনার সন্তান। আমার খুব আনন্দ লাগছে যা কাউকে বলে বোঝাতে পারবো না, এই একটা স্বপ্ন আমি যে কতদিন দেখেছি, ছোট একটা বাচ্চা পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াবে। আর আমি তার পেছন পেছন ছুটে ছুটে তাকে খাইয়ে দিবো। সে ইচ্ছাটা আমার পূর্ণতা পাবে। দেখতে দেখতে তার বয়স সাত মাস ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেকআপ করিয়েছি, ডাক্তার বলেছে আপনার একটা রাজকন্যা আসবে পৃথিবীতে!
≈ আচ্ছা ঐ রাজকন্যার মুখের দিকে তাকিয়েতো আমাকে ভালবাসবেন? ভাল না বেসে কোথায় যাবেন? সে জন্যই মেয়ের নাম ঠিক করে রেখেছি ( মায়া ) ওর মাখা মুখ দেখে হলেও আপনার আমাকে ভালবাসতেই হবে।
≈ সিয়াম জানেন দিন যত এগিয়ে আসছে আমার ততই ভয় লাগছে। আমি এই সময় সাহস দেবার জন্য হলেও স্বামীদের স্ত্রীর পাশে থাকতে হয়। কিন্তু আমার পাশে আপনি নেই, এই কষ্ট কাউকে বলে বোঝাতে পারবো না। প্রতিটা নির্ঘুম রাত্রি জানে সে কষ্ট।
≈ সিয়াম হয়তো আর লেখতে পারবো না। কাল হয়তো পৃথিবীতে আপনার রাজ কন্যা আসবে। জানি না আমি তার সাথে হেসে খেলে যেতে পারবো কিনা। যদি না পারি তবে এর চেয়ে বেশী কষ্ট আর কি আছে তা আমি জানি না।আমি যদি না থাকি তবে ফিরে এসে আপনার রাজকন্যাকে বলবেন, তার মা তাকে পৃথিবীতে আনার জন্য অনেক সংগ্রাম করে হেরে গিয়েছে। কারণ তাকে তার মা অনেক ভালোবাসতো।-
এরপর ডায়েরীতে আর কিছু লেখা নেই, আমি মায়াকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করে দেই সে দিন। কান্নার শব্দে বাবা , মা ছুটে এসে বলেন,
- 'বাবারে অনেক চেষ্টা করে ছিলাম আমরা কিন্তু পারিনি বাঁচাতে আল্লাহ হয়তো নীরাকে অনেক ভালোবেসেছিল তাইতো পৃথিবীতে ওকে রেখে আর কষ্ট দিতে চায়নি। তাইতো তোর মেয়েকে পৃথিবীর বুকে এনে আলোর মু্খ দেখিয়ে নিজে অন্ধকার দেশে চলে গিয়েছে।'
আমার সব কথা যেন সেদিন ফুরিয়ে গিয়েছিল।
নীরার ডায়েরীটা আর মায়াকে বুকে নিয়ে সেদিন থেকে কেটে গেল জীবন থেকে আরও ষোলটি বছর। আজ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অন্যের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে, যখন একলা আকাশের নিচে বসে আছি, মনে হচ্ছে নীরা আকাশের তারা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে আর আমাকে বলছে..।
– “ কি কেমন লাগছে আপনার একলা জীবন? পারবেনতো কাটাতে বাকি দিনগুলো? ”
আমি যে আজ সত্যিই নিঃস্ব হয়ে গেলাম কি করে বলবো নীরা সত্যিই আমি হেরে গেছি আর পারছি না।তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও আমি আসছি তুমি অপেক্ষা করো।।।
সমাপ্ত..
[গল্পকে গল্পের মত নিবেন ভুল গুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, হয়তো গল্পটা অন্যভাবেও লেখা যেতো আরও বড় করা যেতো কিন্তু আপনাদের ধৈর্য হতো না। পরিশেষে বলতে চাই, আপনাদের অনেক ভালোবাসা পেয়েছি যা লেখতে আমাকে অনেক উৎসাহ যুগিয়েছে, সবাই ভাল থাকুন ভালোবাসার মানুষটিকে খু্শি রাখুন, আবারও নতুন কোন গল্পে কথা হবে।আসসালামু আলাইকুম]


The interactive features make the site engaging and memorable."
উত্তরমুছুনIts very nice
উত্তরমুছুনSo good
উত্তরমুছুনBravo! Your content is like a breath of fresh air in the digital world.
উত্তরমুছুনThis is such an informative piece. Thanks for sharing!
উত্তরমুছুনNice one!
উত্তরমুছুনImpressed with the site's responsiveness – works seamlessly on both desktop and mobile.
উত্তরমুছুনthank you for sharing. Deeply appreciated!
উত্তরমুছুনIncredibly insightful article, seamlessly blending depth of analysis with clarity of expression – a captivating read!
উত্তরমুছুন