≈ গল্পঃ মাইশা মৃত্যু ≈
--------------------------------
আমার গলা শুকিয়ে কাট হয়ে গেলো। হাত দুইটা কাঁপছে। পুলিশ তো ধাক্কা দিয়ে দেখলো তখন। কিন্তু তখন অবধি বেলকনির গ্রিল তো ভালোই ছিলো।এখন কিভাবে আলগা হয়ে এক পাশ খুলে যাচ্ছে?
বেলকনি গ্রিলের আলগা হয়ে যাওয়া অংশে এবার জোরে চাপ দিতেই পাশের একটা বড় অংশ ছাড়িয়ে গেলো। এই ছাড়ানো অংশের ভেতর দিয়ে খুব সহজেই একটা মানুষ বের হতে পারবে। আর যেহেতু নিচতলা তাই লাফ দিয়ে পালিয়ে যাওয়াটা খুব সহজ ব্যাপার।
গলাটা এতো শুকিয়ে এলো যে রুমে গিয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলাম এক নিশ্বাসে। হাতটা আমার এখনো কাপছে। কোনরকমে গ্লাস টা ধরে আছি। আর একটা রহস্যের ভেতর ঢুকে গেলাম আমি। বেলকুনির গ্রিলের একপাশ ছাড়াতে গিয়ে তাকে ছয়টা জয়েন্ট কাটা লাগবে। সেটার জন্য ও সময়ের ব্যাপার। রে'প করে গলা টিপে হত্যা করে ঠান্ডা মাথায় এতগুলা জয়েন্ট কাটা কখনোই সম্ভব না।
আর মেইন দরজা দিয়ে যদি কেউ এসেই থাকে তবে মাইশা কখনো ছিটকিনি লাগাবে না। না কি হত্যা করেই সিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছে? একজন কে রে'প করছে আর কেউ টের পেলো না?
আমার মাথাটা আবার ঘুরে এলো। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলাম। তিন দিন ঘুম নাই চোখে তাতে আমার পৃথিবী হারানো কষ্টের পাহাড় বুকে চাপা আর এদিকে রহস্যের জালে গলা অবধি জড়িয়ে। আমি আর পারছি না। শরীরের সমস্ত শক্তি যেন শেষ হয়ে এলো। বড্ড ক্লান্ত আমি।
বিছানায় দেহটা এলিয়ে দিতে না দিতেই কলিংবেলের আওয়াজ।
এই মুহুর্তে কলিংবেলের আওয়াজ যেন বিষের মত লাগলো কানে। দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম সকাল ৬.৫৯। এখনি সকাল হয়ে গেলো? আর এই সাতসকালে আবার কে এলো শান্তনা দিতে?কলিংবেল ওদিকে বেজেই যাচ্ছে। দ্রুত পা-এ হেঁটে দরজা খুলতেই দেখি দুইটা পুলিশ কনস্টেবল আর একজন এস.আই. অফিসার। মনে মনে বিরক্তি নিয়ে বললাম এদের সংসার ধর্ম নাই নাকি? না কি আমার মতো এই কেসের রহস্যে ওদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছে?
অফিসার আমার ঘোর ভাঙিয়ে দিয়ে দয়ামায়াহীন কণ্ঠে বললেন,
– “ ভেতরে যেতে পারি? কিছু ইনফরমেশন জানার ছিলো। ”
আমি তড়িঘড়ি করে,
– “ হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই। আগে ভেতরে আসুন। আসলে এতো সকালে আপনাদের দেখে ভাবছিলাম আপনাদের রাতে ঘুম ভালোমতো হয়েছে কি না। ”
অফিসার মুখে অস্পষ্ট হাসির রেখা ফুটে তুলে বললেন,
– “ আমাদের ঘুম হোক বা না হোক আপনার যে এই কয়দিন ঘুম হচ্ছে না সেটা বোঝাই যাচ্ছে। ”
আমি একটু চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন করলাম,
– “ কিভাবে? ”
অফিসার তাচ্ছিল্য স্বরে বললেন,
– “ আরে ঘাবড়াবেন না। সন্দেহ নিয়ে কোন কথা বলছি না। আপনার টকটকে লাল চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে। যাইহোক যে কাজে এসেছিলাম... ”
অফিসারের কথা শেষ হতে না দিয়েই বললাম,
– “ কাল রাত তিনটার দিকে একটা ঘটনা ঘটেছে। ”
অফিসার আমার দিকে ফিরে ভ্রু কুচুকে উৎসাহ নিয়ে বললেন,
– “ কি ঘটনা? ”
– “ কাল রাতের চাঁদটা অনেক উজ্জ্বল ছিলো দেখেছেন আপনি....?
– “ চাঁদ টাদ দেখার সময় নাই মশাই। নানান ঝামেলার মধ্যে থাকতে হয়। ওসব অনুভূতি মরে গেছে। ”
অফিসারের কণ্ঠে চরম হতাশা খুঁজে পালাম। তার ও হয়তো রুপালী মায়াবী চাঁদ দেখার খুব ইচ্ছে জাগে। হয়তো বউকে ডাকে। কিন্তু আমার মাইশার মতো তো সব মেয়ে চাঁদ প্রেমিক না। হয়তো এমন বিদঘুটে কালো কোন মেয়ের সাথে অফিসারের বিয়ে হয়েছে।
অফিসার আবার বললেন,
– “ হ্যাঁ তারপর কি হলো? ”
– “ চাঁদ টা আমার বেলকনি থেকে সম্পূর্ণ দেখা যায় না। তাই বেলকনির গ্রিলে একটু দেহের ভর দিয়ে চাঁদটা দেখতে গেছিলাম।তারপর হঠাৎ দেখি.. ”
থেমে গেলাম আমি।
– “ কি হলো থামলেন যে? কি দেখলেন? ”
আমি উনাদের ডেকে বেলকনিতে নিয়ে গেলাম।গ্রিলের খোলা অংশটা দেখিয়ে দিলাম। একজন কনস্টেবল ছবি তুলে নিলো ক্যামেরায়।
অফিসারের মুখে চিন্তার ছাপ দেখতে পাচ্ছি। উনি নিজে আবার হাত দিয়ে খোলা অংশটা নাড়াচাড়া দিয়ে দেখছেন।আমি বাইরে তাকাতেই মেইন গেইটে টুলের উপর বসে থাকা দারোয়ানের দিকে চোখ পড়লো। ওর দিকে চোখাচোখি হতেই একটা অপরাধ ভাব দৃষ্টি নিয়ে চোখ সরালো আর অন্যদিকে তাকালো। ব্যাপার টা একটু খটকা লাগলো আমার।আবার ভাবলাম পুলিশ টুলিশ দেখে ওদের আবার হুদাই ভয়ে থাকে। তার জন্যই হয়তো।
অফিসার বললেন,
– গোলমেলে এই ব্যাপারটার কিছুটা কূলকিনারা খুঁজে পেলাম আমি । তাহলে ব্যাটা এখান থেকেই কেটে পড়ছে হয়তো । ”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে মাথা নাড়ালেন অফিসার।আবার বললেন,
– “ আচ্ছা, আপনার বা আপনার ওয়াইফের সাথে কার কার শত্রুতা ছিলো। এই ধরেন কোন ব্যাপার নিয়ে দ্বন্দ বা মনোমালিন্য? ”
আমি একটু ভেবে নিলাম, ‘আমার শত্রু? কই তেমন তো কাউকে তো দেখি না। কিন্তু মাইশার কি ছিলো? কারো সাথে ঝামেলা হলে তো আগে আমাকে বলবে। টিভি সিরিয়ালের পুরো কাহিনী আমাকে না বললে ওর ঘুম হতো না আর সেখানে এসব তো লুকোনোরই কথা না।’
আমি অফিসারের দিকে ফিরলাম। উনি উত্তরের আশায় উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
আমি বললাম,
– “ দেখুন অফিসার তেমন কারো সাথে কোন ঝামেলা নাই আমার। আমি বদলী হয়ে এখানে এসেছি মাত্র ৩ মাস হয়েছে। আর আমার ওয়াইফের সাথে যদি এমন কিছু হলে আমি আপনাদের আগে জানতাম। আমার কাছে ও কোনকিছু লুকাতো না। ”
অফিসার আমার কথা শুনে মুচকি হাসি দিলেন দিয়ে বললেন....
– স্বপ্নীল ভাই... এমন অনেক কিছুই থেকে যায় যা কাছের মানুষ ও টের পায় না।
যাইহোক সে দিকে না যাই। এই নিন আমার ফোন নম্বর। কোন কিছু জানতে বুঝতে পারলে অবশ্যই আমাকে জানাবেন। আজ আসি তাহলে। ”
এই বলে কটমট করে সবাই চলে গেলো। আমি তাকিয়ে দেখছি ওদের চলে যাওয়া। মাথায় ভেতর দারোয়ানের অপরাধ মাখা দৃষ্টিটা ঘুরপাক খাচ্ছে বারবার।দারোয়ান কে কেন সন্দেহ করছি?ও তো রে'প করতে পারে কিন্তু মেরে ফেলবে কেন?তবে যে মেরেছে তার অনেক দিনের প্লানিং ছিলো নিশ্চয়। এই গ্রিল হয়তো আগে থেকেই কেটে রাখছে। সময় সুযোগ বুঝে ভেতরে ঢুকছে। কিন্তু দারোয়ান? ও তখন কোথায় ছিলো?
ভাবা মাত্রই হনহন করে বাইরে বের হয়ে দারোয়ানকে ডাক দিলাম।ও প্রথমে ইতস্তত করে তারপর আসলো। ওর মুখের ভঙ্গী দেখে মনে হচ্ছে এই মাত্র ভূত দেখে এসেছে।
আমি রুক্ষভঙ্গী নিয়ে কড়া গলায় বললাম,
– “ কি রে? এমন ইতস্তত কিরতেছিস কেন? ”
– “ না.. মানে.. ভাইজান... ”
ওর কথা না বলতে দিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম তাদের দিকে ,
– “ তুই কাল দুপুরে কোথায় ছিলি? ”
– “ ভাইজান.. দুপুরে তো আমি এই হানেই বইয়া আসছিলাম। আকটু খাওনের জন্য গেছিলাম ২৫-৩০ মিনিয়ের জন্যে.. ”
– “ আচ্ছা। আর বিকালে? ”
– ” আর বিকালে ভাইজান ... বাড়িওয়ালা চাচা আমারে দুকানে....পাঠাইছিলো ভাইজান । আসতে একটু দেরি হইছিলো ভাইজান। ”
– “ আচ্ছা বল.. তোর ভাবী যেদিন খুন হলো সেই দিন এই বিল্ডিং এ অপরিচিত আর কে কে ঢুকেছিলো? ”
– “ ভাইজান.. দুপুরের দিকে একটা লোক ঢুকেছিলো। ”
আমি ভ্রু কুচকে ওর দিকে তাকালাম।
– “ লোক? তুই চিনিস তারে? কেমন দেখতে সে? কোন বাসায় ঢুকেছিলো? ”
এক দমে সব প্রশ্ন করলাম। বুকের ভেতর যেন উত্তেজনা বেড়ে গেলো।
দারোয়ান এদিক-ওদিক চোক পাকিয়ে বললো,
– “ ভাইজান.... শ্যামলা করে মোটামুটি লম্বা একটা লোক।আমি পরিচয় জিগাইতে, কয় যে মাইশা ভাবীর কাছে যাবে। আমি ভাবলাম আপনেদের কোন আত্নীয় হবে। তাই কিচু কইনি ভাইজান। ”
এতোক্ষণে সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো কিন্তু দারোয়ানের এই কথা শুনে সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেলো।অপরিচিত লোক, সে ঠান্ডা মাথায় গ্রিল কাটবে কিভাবে ? আর কাটলে তো দারোয়ান বা অন্যকেউ দেখতে পাবে তাই না..?
আমি এক ধমক দিয়ে বললাম,
– “ এই... আমার সাথে বানিয়ে বানিয়ে গল্প করছিস? এক থাপ্পড়ে তোর দাঁত ফেলে দিবো বেয়াদব। ”
আমার এই রূপ দেখে দারোয়ান বেশ ভালোই ভিমড়ী খেলো।
মাথা নিচু করে বললো,
– “ ভাইজান ধমকান ক্যান? হাচায় তো কইলাম। ”
আমি আরো শক্ত হয়ে বললাম,
– “ পুলিশ এসে পাছায় বাড়ি শুরু করলে এমনিতেই সব সত্যি বের হবে।যা এখন...! ”
ও কোনরকমে আমার চোখের সামনে থেকে পালালো।দারোয়ানের প্রতি সন্দেহটা আরো শক্তপোক্ত হলো।হয় ওই করেছে নইলে ওকে কেউ টাকা খাইয়ে মুখ বন্ধ করেছে।
এরিমধ্যে ফোনে কল এলো।দেখি নাঈমার নম্বর থেকে কল। শালিকা মাইশা মারা যাওয়ার পর থেকে বারবার ফোন দিচ্ছে।নানান অযুহাতে ফোন দেয়।বলে যে, আপুর জন্য খুব খারাপ লাগছে আম্মুর কান্না তো থামছেই না আরো কত কি কথা।
ফোন রিসিভ করলাম।ওপাশ থেকে নাঈমার মিষ্টি কণ্ঠ। মেয়েটা দেখতে যেমন সুন্দর কণ্ঠটা ও। আল্লাহ যেন নিজ হাতে নিখুঁত করে সৃষ্টি করেছেন মেয়েটাকে।
– “ দুলাভাই.. ”
– “ হ্যা বলো নাঈমা। ”
– “ বাড়িতে তো আপুর মৃত্যুর জন্য দোয়া-মাগফিরাতের আয়োজন করেছে। তাই আম্মু বললো আপনাকে আসতে। আজই চলে আসেন দুলাভাই। ”
– “ নাঈমা তুমি তে জানোই তোমার আপু খু*ন হয়েছে। পুলিশ আমাকে এখন চোখে চোখে রাখছে। এই মুহুর্তে শহরের বাইরে যাওয়া ঠিক আমার জন্য ঠিক হবে না। ”
– “ না না ভাইয়া কোন কথা শুনবো না। আপনাকে আসতেই হবে। আপনি আজই আসছেন এটাই শেষ কথা রাখি..... ”
এই বলে কেটে দিলো আমার কোন কথা না শুনেই। বড্ড চঞ্চল মেয়েটা। এমনভাবে বললো যেন ওর আপুর দোয়া-মাগফিরাতের চেয়ে আমাকে যাওয়াটা বেশি জরুরী।
ওদিকে ফুটফুটে লক্ষী বউমাটার জন্য আম্মু প্রাই ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে।বিভিন্ন স্মৃতি বলতে থাকে ওর আর আম্মুর। আমি নীরবে শুনি আর চোখদিয়ে টপটপ করে জ্বল ঝরতে থাকে। বুকের ভেতরটা ফেটে যায়। কোনরকমে নিজেকে শান্ত করে আম্মুকে বুঝ দেই।
একটা দীর্ঘস্বাস ফেলে বিল্ডিং এর সামনের ফাঁকা জায়গাটাতে হাঁটাহাঁটি করছিলাম।মাইশা মারা যাওয়ার পর এই প্রথম বাইরে বের হলাম। কাদের ভাই ডেকেডেকে উনার বাসায় নিয়ে গিয়ে খাবার দিতেন। খাবার গলা দিয়ে নামতো না।
বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে করতে হঠাৎ পা-এর নিচে কি জানি ঠেকলো।তাকিয়ে দেখি একটা কানের দুল। এই মুহুর্তে আমি আমার বাসা বরাবর দাঁড়িয়ে। সন্দেহ নিয়ে দুলটা হাতে নিলাম। দুলটা সোজা করতেই আমি একটা ধাক্কা খেলাম।
এটা যে আমার মাইশার দুল! এখানে কেন পড়ে আছে । ও তো বেড়াতে যাওয়া ছাড়া এই দুল পরে না।
আমি সাথে সাথে দ্রুত পা-এ বাসায় যেয়ে আলমারির দরজার হাতল ধরতেই দরজা খুলে এলো। কি? দরজা খোলা? ভেতরে তাকিয়ে দেখি মাইশার দুই সেট দুই বাক্সে রাখা গহনার একটা ও নাই। খালি বক্স পড়ে আছে। এতদিনে একবার ও আলমারির দিকে চোখ পড়লনা আমার?
এসব দেখে আরো দুর্বল হয়ে গেলাম আমি। রহস্য যেমন দিন দিন আরোগ্য বের হচ্ছে।


nice story
উত্তরমুছুনThis is exactly what I needed to read today. Your insights are spot-on, and I appreciate the positive vibes!
উত্তরমুছুনI learned something new with every paragraph. Educational and entertaining.
উত্তরমুছুনThat was amazing website
উত্তরমুছুন
উত্তরমুছুন"The site's layout is like a well-organized workspace – clutter-free and efficient."
Short and sweet – this comment section reflects the best of concise yet impactful opinions
উত্তরমুছুন"I love the interactive elements on this website. They make the browsing experience more engaging."
উত্তরমুছুনI love how this site combines functionality with a visually appealing layout – well done!
উত্তরমুছুনYour consistency in delivering quality content is truly admirable.
উত্তরমুছুন"A storyteller's paradise! This website is my go-to for immersive tales, writing tips, and a community that celebrates the art of storytelling."
উত্তরমুছুনhelpfull
উত্তরমুছুনI've implemented your suggestions and noticed a difference. Thanks!
উত্তরমুছুন