প্রতি শুক্রবারে মসজিদের কাছে ওরা সবাই দাঁড়িয়ে থাকতো। মসজিদ কাছে পর্যন্ত যাবার সাহস তাদেট হতো না। জুম্মার নামাজ শেষে মিলাদের জিলাপী বিতরণ করতো হুজুর। জিলাপী বিতরণের সেই দৃশ্য দেখে ওদের মুখ থেকে লালা ঝরতো , চোখদুটো ছলছল করতো তাদের । কিন্তু ওদের জন্য জিলাপী নিয়ে আসতো না কেউ । ওরাও জিলাপীর লাইনে দাঁড়ানোর সাহস পেত না!
জগা আর যোগেন নাম ওদের। সুবাদে ওরা চাচাতো ভাই। তপন বাগদী ও রতন বাগদী- দুই ভাইয়ের দুই ছেলে। কতই বা বয়স হবে ওদের, বড়জোড় ৭ কী ৮। ওদের বাবারা সারাদিন খালে মাছ ধরে। আর মায়েরা বন-বাঁদাড় হতে খড়ি কুড়ায়, শাকপাতা সংগ্রহ করে। তাতেই কোনোমতে দুইবেলা ওদের খাওয়া জোটে। বাজার থেকে মিষ্টি কিনে এনে ওদের খাওয়ানোর সামর্থ্য যেমন ওদের বাবাদের নেই, তেমনি মিষ্টি খাবার বায়না ধরার সাহসও ওদের নেই। তাই মিলাদের জিলাপীর আশায় প্রতি শুক্রবারে এখানে আসে ওরা।
জিলাপীর ঠোঙা হাতে মসজিদের বারান্দায় এসে দাঁড়ায় আজিজ।
জগা ফিসফিসিয়ে যোগেনকে বলে,
-- 'এক্কনই জিলাপী দিবেনে রে!'
-- 'দিলি পারেই আমাগের কি!'
আপসোস করে বলে যোগেন।
-- 'যদি এক্কেন পাঞ্জাবী থাকতো, তালিপারে ভালো হতো নারে যোগেন; কেউ আমাগের চিনতি পারতো নানে! হো হো হো...'
-- 'হা হা... তার চাইতে মোসলমান হলে তো পারে আরো ভালো হতো ! তখন কেউ আর আমাদের নিষেধ করতে পারতো নানে!'
-- 'চল, নাহয় পিছনে যায়ে দাঁড়েইগে।'
-- 'নারে, যদি মারে?'
-- 'মাইর তো আমরা জীবনে মেলাই খাইছি, চল আবার নাই কয়ডা খালাম, এত ভয় পাচ্ছিস কিসির জন্য তেরা ?'
-- 'হে হে হে... তুই যা তালি আগে; তোরে না মারলি আমি যাবোনে পরে।'
-- 'না, আমি একা যাতি পারবো নানে।'
এভাবেই একসময় জিলাপী বিতরণ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু জগা ও যোগেন তাদের মনস্থির করতে পারে না। মন খারাপ করে ফিরে যায় ওরা।
মসজিদের পাশেই ছিল মক্তব। গ্রামের ছেলেপুলেরা ওখানে কোরআন শেখে। শিক্ষক বলতে মাত্র দুজন। একজন মসজিদের ইমাম আয়নাল হুজুর। সবাই তাকে বড়ো হুজুর বলে ডাকে। অন্যজন মসজিদের মুয়াজ্জিন আজিজ। সবাই তাকে ছোটো হুজুর বলে ডাকে। ছেলেরা ছোটো হুজুরকে বাঘের মতো ভয় পায়। কেউ পড়াশোনা না পারলে, বা দুষ্টুমি করলে কম করে হলেও ৫-১০টা বেত্রাঘাত তার পিঠে ফেলতে মোটেই কার্পন্য করে না আজিজ।
পরের শুক্রবারে যথারীতি আজিজ জিলাপী বিতরণ করছিল। হঠাৎ লাইনে দাঁড়ানো একজন বলে উঠলো,
-- 'হুজুর একটা কথা ছিল?'
-- 'তাড়াতাড়ি বলে ফেলা।'
সম্মতি দিয়ে বললো আজিজ।
-- 'হুজুর, মামুন আপনার সাথে চিটারী করেছে।'
-- 'চিটারী করেছে মানে?'
-- 'ও মোট ৩ বার জিলাপী নেছে। আপনি টের পাননি। আমি দেখিছি।'
-- 'কী বললি? সত্যি তো?'
-- 'জি হুজুর, সত্যি।'
-- 'ঠিক আছে, কাল তাহলে মক্তবে ওর বিচার করা হবে।'
-- 'ও এখনো বাড়ি যায়নি হুজুর, ঐ পুকুরপাড়ে গেছে। আপনি এখনি ইচ্ছে করলি ওকে ধরতি পারবেনেন।'
-- 'তাই? চলতো তাহলি।'
জিলাপীর ঠোঙাটা রেখে পুকুরপাড়ের দিকে এগিয়ে চললো আজিজ। তার পিছে পিছে গেল ছেলেগুলোও। পুকুর পাড়ের ঘন ঝোপটার আড়াল থেকে কথা বলার আওয়াজ আসছিল। আজিজ ইশারায় সবাইকে চুপ করতে বলে নিজে চুপিচুপি এগিয়ে গেল। ঝোপের আড়ালেই গোল হয়ে বসে জিলাপী খাচ্ছিল ওরা তিনজন; জগা, যোগেন আর মামুন।
-- 'দেখ, তুরা আর আসপিনে কলাম হেনে। আমি তোগের জন্যি প্রত্যেকদিন এমবায়ে জিলাপী চুরি করতি পারবো নানে। ছোটো হুজুর টের পালি আর আমারে আস্ত রাখপি নানে।'
যগা ও যোগেনকে শাসালো মামুন।
-- 'আচ্ছা ভাই আর আসপো নানে।'
সম্মতি জানালো যোগেন।
-- 'আপনাকে থ্যাংকো। হো হো হো...'
বলেই হাসতে লাগলো জগা।
-- 'হা হা হা।'
ওদের হাসিতে যোগ দিল মামুনও।
.
আজিজ যেমন চুপিসারে গিয়েছিল, তেমনি চুপিসারে আবার ফিরে এল। তারপর পুনরায় জিলাপী বিতরণে মন দিলো। আজিজের এমন আচরণে ছেলেপুলের দল বড়ো অবাক হলো। ফেরার পথে ওরা একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলো,
-- 'আচ্ছা- ছোটো হুজুর মামুনকে কিছু কলো না কিস্যির জন্যি?'
-- 'আমিও তো তাই ভাবতিছি। এতবড়ো এট্টা অন্যায় করলো মামুন, মসজিদের জিলাপী কি-না বাগদীগের খাওয়ালো; তাও হুজুর কিছু কলো না?' তাহান বললো কথাগুলো।
-- 'আমার মনে কয় হুজুর ওরে বড়ো শাস্তি দিবি, তাই এখন কিছু কলো না। দেখিস কালকে মক্তবে ওকে ঠিকই মারে পিঠির ছাল তুলে দিবেনে।'
মেহের কারণ ব্যাখ্যা করলো।
-- 'আমারও তাই মনে হয়।' মেহেরের কথায় সাঁয় দিলো রিয়াজও।
'
এভাবেই একেকজন একেকরকম কথা ভাবতে লাগলো। এককান দু'কান করে মামুনের কানেও পৌঁছে গেল খবরটা। কিন্তু পৌঁছালো আরো ভয়ষ্কররুপে। মামুন জানতে পেলো, কাল ছোটো হুজুর তাকে ভয়ানক শাস্তি দেবার কথা ঘোষণা করেছে। ভয়ে তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। সারাদিন মনমরা হয়ে রইলো সে। আপন মনে নানা রকম জল্পনা-কল্পনা করতে থাকলো সে। তার মনে হতে লাগলো- সত্যিই সে ভুল করেছে।
মসজিদের জিলাপী তো বাগদীদের পাবার কথা না। আর ওরা দু'জন তো প্রতি শুক্রবারেই আসে। কেউ তো আর ওদের জন্য জিলাপী এনে দেয় না। তবে ও কেন বোকার মতো ওদের জন্য চুরি করতে গেল? একে তো মসজিদের জিলাপী চুরি করেছে, তার উপর তা আবার বিধর্মীদের দিয়েছে। হুজুর নিশ্চয় তাকে মেরে আস্ত রাখবে না। মামুন ভাবলো তার বাবা-মা শুনলেও বোধহয় রাগ করবে। তাই বাবা-মাকেও কিছু জানাতে সাহস পেল না মামুন।
-
সারারাত ঘুম এলো না মামুনের। শেষরাতে সে ভয়ানক স্বপ্ন দেখলো। স্বপ্নে দেখলো ছোটো হুজুর তাকে এতই মেরেছে যে তার হাড় কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে। নিজের নির্বুদ্ধিতায় রাগে-দুঃখে কাঁদতে লাগল মামুন।
সকালে সে ভাবলো আজ সে মক্তবে যাবে না। কিন্তু মামুনের বাবা তা মানলো না। জোর করেই মামুনকে মক্তবে দিয়ে আসলো।
মক্তবের অন্য ছেলেরা শুরুতেই মামুনকে একবার ভৎসনা করে নিলো। ছোটো হুজুর ক্লাসে এসেই প্রথমে মামুনকে সামনে ডাকলো। মামুন কাঁদো কাঁদো হয়ে সামনে গিয়ে অপরাধীর বেশে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। আগাম শাস্তির ভয়ে তার বুকটা দুরুদুরু করছিল।
ছোটো হুজুর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-- 'কাল যা হয়ছে, বিরাট অন্যায় হয়ছে। কি হয়ছে না?'
সবাই সমস্বরে জবাব দিল,
-- 'জি হুজুর, হয়ছে।'
-- 'এই অন্যায়ের জন্য তো তাদের বিচার হওয়া উচিৎ কি বলেন আপনারা উচিৎ না.. ?'
-- 'জি হুজুর, উচিৎ।'
-- 'তাহলে কী তাদের শাস্তি দেওয়া উচিৎ এই অপরাধের জন্য
ছোটো হুজুর আবার জিজ্ঞেস করলো।
-
কেউ বলল
