দুটো জগৎ

 


গায়ের জামা ঠিক করতে করতে শিমু বললো, 

-- "স্যার আমার টাকাটা দেন।"


আজগর আলী নির্লজ্জের মত বললেন,

-- "কাম অন মাই ডিয়ার , টাকা নিয়ে তুমি একদম চিন্তা করবে না , বাইরে আমার আমার PS  আছে ও  সব পেমেন্ট করে দিবে , আজ তাহলে আসি আমি। অন্য কেনদিন আবার আসবো তোমার শরীরের স্বাদ নিতে।"


শীমু দরজা বন্ধ করে চাপাকান্না করতে লাগলো। কি নিষ্ঠুর এই পৃথিবী, অগঠিত সমাজ। দিনের আলোয় জনগনের জানমাল রক্ষা করার মিথ্যে অভিনয় আর রাতে নারীর শরীর ভক্ষন।

.

আমি শিমু, পরিবারের বড় মেয়ে। ঢাকায় প্রথম সারির একটা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়ালেখা করার উদ্দেশ্যে আসি।কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দু-মাস যেতে না যেতেই বাবা না ফেরার দেশে চলে যান। 


কিছুদিন পর বাবার ভাইয়েরা জোর করে সব জায়গা-জমি দখল করে ফেলে। ছোট দুই ভাই আর মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব তখন আমার কাঁধে এসে পড়ে,এদিকে নিজের খরচ। 


দিশেহারা হয়ে পড়ছিলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম টিউশনি করাবো কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও টিউশনি পেলাম না। বন্ধু-বান্ধবরাও অনেক চেষ্টা করেছিলো কিন্তু সবাই ব্যর্থ।

.

কয়েকদিন পর একটা চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। একটা অফিসের রিসিপশনের জন্য মেয়ে লাগবে। ইন্টারভিউ ভালোই হলো কিন্তু চাকরি কনফার্ম করার আগে বস আমাকে একটা কুপ্রস্তাব দিলো। রাগে সেখান থেকে বেরিয়ে আসলাম।


এভাবে পর পর পাঁচ-ছয়টা ইন্টারভিউ দিলাম। দু-তিনটাতে পরে জানাবে বলে আর বাকিগুলোতে মানুষধারী পশুগুলো চাকরি কনফার্ম করার জন্য আগের মত কু প্রস্তাব দেয়। খুব অসহায় লাগছিলো। বিধাতাকে প্রশ্ন করলাম, সুন্দরী হয়ে জন্মানোটা কি পাপ???


ততদিনে পরিক্ষা চলে আসলো। পরিক্ষার টাকা এদিকে বাড়ি থেকে বারবার মায়ের ফোন! খুব অসহায় লাগছিলো। 


সর্বশেষ একটা ছোট্ট অফিসে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। সেখানেও চাকরি মিললো না। খুব রিকুয়েষ্ট করলাম কিন্তু কোনে লাভ হলো না। বেরিয়ে আসবো ঠিক সে সময় একটা লোক এসে বললো, 

-- "একটা কাজ আছে আমার কাছে করতে পারলে অনেক টাকা পাবেন কিন্তু ভেবে দেখেন ।"


লোকটার চোখের ভাষা বলে দিচ্ছে কাজটা কি। আমি কিছু না বলে চলে আসতে চাইলাম। লোকটা আবার বললো, 

-- "আপনি ভেবে দেখবেন এই নিন আমার কার্ড! জানিনা কি মনে করে আমি কার্ডটা হাতে নিয়েই বাসার দিকে তাড়াহুড় করে চলে আসলাম।"


.


দুদিন পর পরিক্ষা এদিকে মা ফোন করে জানালো ঘরে বাজার-সদাই কিছু নেই। মনকে শক্ত করে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে ঐ কার্ডে থাকা নাম্বারে কল দিলাম।


লোকটা হ্যালো বলতেই পরিচয় দিলাম। শামীম ভাই(লোকটার নাম) পরিচয় দিতেই চিনে ফেললেন। জিজ্ঞেস করলেন, 


-- "কেমন আছি আর কাজ করতে ইচ্ছুক কিনা।"


বাবার কথা খুব মনে পড়ছিলো, মনে মনে বললাম "বাবা আমায় ক্ষমা করে দিও" শামীম ভাইকে আস্তে করে হ্যাঁ বলে দিলাম। শামীম ভাই ফোন করে বিস্তারিত জানাবেন বলে ফোন কেটে দিলো।


.


আমার সমস্ত পৃথিবী থমকে গেছে। মনে পড়ে গেলো সেই ছোটবেলার কথা। বাবা স্কুলে নিয়ে যেতেন৷ গ্রামের সব মেয়ে মিলে নদীতে গোসল করতে যেতাম। ঝুম বরষায় বৃষ্টিতে ভিজতাম। একবার তো দুষ্টুমি করতে গিয়ে স্কুলে সিড়ি থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেলছিলাম। সেবার বাবা খুব বকা দিয়েছিলেন, আমি জানি ওটা বকা না ওটা আমার জন্য মমতা। টানা একমাস আর স্কুলে ঘেষতে পারি নি। 


এই সময়টাতে বাবা-মায়ের যত্ন কোনোদিন ভোলার নয়। বাবা সবসময় আমার প্রিয় খাবারগুলো নিয়ে আসতেন আর মা, আমি যা পছন্দ করতাম তাই রান্না করতো। এভাবেই বড় হতে লাগলাম যেখানে ছায়ার মত বাবা ছিলেন সবসময়। আর আজকে বাবা নেই বলে আর ভাবতে পারছি না, চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি বের হতে লাগলো। ঠিক সেই মুহুর্তে শামীম ভাইয়ের কল, 


: "শিমু, তুমি সিওর তো কাজ করবা? দেখো এখানে কাজ করতে হলে ইমোশন দেখালে চলবে না। আমার ক্লাইন্টগুলা ভি.আই.পি, তাদের খুশি করতে পারলে মোটা অংকের টিপসও পাবা তুমি। ক্লাইন্ট থেকে পাওয়া টাকার ৩০% আমাকে দিতে হবে। আর হ্যাঁ তোমার ব্যাপারে সবরকম গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। এখন বল, তুমি রাজি কিনা?"


নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে এবার আর আগের মতে কোনো জড়তা না দেখিয়ে শামীম ভাইকে সরাসরি  বললাম, 

-- "হুমম আমি রাজি।"


কালকের জন্য রেডি থাকতে বলে শামীম ভাই ফোন কেটে দিলেন। 

.


এই মুহুর্তে শামীম ভাইয়ের সাথে আছি,

কোথায় যাচ্ছি জানি না। অনেকটা যাওয়ার পর রাস্তার পাশের দোকানের বিলবোর্ড দেখে বুঝলাম এটা উত্তরা।শামীম ভাই ড্রাইভারকে পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। হয়তো গন্তব্যে চলে আসছি কারন গাড়ি ততক্ষণে থেমে গেছে। শামীম ভাই আর আমি আমরা দু'জনে  গাড়ি থেকে নামলাম, শামীম ভাই একটা বিল্ডিং লক্ষ করে সে  বরাবর হাঁটতে লাগলো আমি তার পিছে পিছে হাঁটতে লাগলাম । 


লিফ্টে ঢুকে শামীম ভাই (০৪) বাটন চাপ দিলো। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা এপার্টমেন্টের সামনে চলে আসলাম। শামীম ভাই কলিং বেল চাপতেই, একটা মাঝবয়সী লোক দরজা খুলে ভিতরে যেতে বললো।


শামীম ভাই লোকটার সাথে কি কি যেন বলছিল। আমি খুব ভয় পাচ্ছিলাম কিন্তু সেটা প্রকাশ না করে যথাসম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি কারন শামীম ভাই আগেই বলেছিলো ইমোশন দেখানো যাবে না। হয়তো এই পথে ইমোশন দেখানো যায় না।


শামীম ভাই কথা শেষে আমার কাছে এসে, 

-- "আমি  আসি আজকে, কাল সকালে বেলায় এসে আমি তোমাকে আমার সাথে নিয়ে যাবো এখান থেকে আজ তুমি  থাকে তাহলে আমি গেলাম   " 

বলে চলে গেলো।


আমি দরজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে লোকটাকে খুঁজতে তাকাতেই দেখলাম লোকটা আমার দিকে আসছে, চোখেমুখে জানোয়ারের ছাপ। কাছে এসেই আপত্তিকর জায়গায় হাত দিতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর লোকটা আমাকে কোলে তুলে বেডরুমে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।


গল্প : দুটো জগৎ

পর্ব : ০১


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন