শ্বাশুড়ি_মা



বিয়ের এত বছর পার হয়ে গেল আমি এখন পর্যন্ত মাছের লেজ খেতে পারি না। 
এ বাড়িতে মাসিকলেস কেউই খেতে চায় না তাই আমাকেই খেতে হয় । 

দরিদ্র বাবা মার একমাত্র সন্তান হলেও অনেক আদরেই বড় করে তুলছেন তারা আমায়। বাড়িতে বাবা মাছ আনলে মাছের পেটি, পিচ ছাড়া অন্য কিছু খেতাম না আমি, খেতে পারতাম না কাঁটার জন্য, মা প্রায়ই মাছের কাঁটা বেছে দিতেন।

.

আর এ বাড়িতে আসার পর কোনোদিন মাছের মাথা কিংবা পেটের অংশ খাইছি তাহলে আমার মনে পড়ে না। 

আজো মাছের লেজ আমার পাতে তুলে দিলেন শ্বাশুড়ি, এতো সব কঠিন কাজ করতে পারি কিন্তু এই মাছের লেজ যেনো আমার চিরশত্রু খেতে বসলেই গলায় কাঁটা বিধবে আবার কাঁটা চলেও যায় তাড়াতাড়ি শুধু ভাত বল করে গিলে খেলে।

.

আর মাঝে মধ্যে তে কাটতে গিয়ে আমি বমি করে ফেলি, আমার দিকে কারো খেয়ালই থাকে না । 

বাড়ির সবার খাওয়া শেষে আমরা চারজন খেতে বসি, আমি, আমার শ্বাশুড়ি, চাচী শ্বাশুড়ি আর কাজের মেয়েটা। পরিবার এর বাকি মানুষজন আগেই খেয়ে নেয়।

তারপর যা থাকে আমরা ভাগ করে খাই। মাঝেমধ্যে রান্না ভালো হলে কোনো খাবার অবশিষ্ট না থাকলে মুড়ি, মুড়কি কিংবা চিঁড়া ভিজিয়ে খেয়ে থাকি।

আমার খুব কষ্ট হয় তখন ভাত না খেয়ে থাকতে, বাড়িতে বাবা মা না খেলেও আমায় সময়মতো খেতে দিতো। 

মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় এতো সাবধানতা অবলম্বন করি, তবুও কাঁটা গলায় বিধবেই। আমার মনে হয় রান্না করা মাছের লেজটা আমার সাথে খেলা করে, গলায় কাঁটা বিধানো আর কাঁটা সরানোর খেলা।

.

খাওয়া শেষে যে দু একটা প্লেট বাটি থাকে সেগুলো আমি পরিস্কার করি, আর আগের সব বাসন মেয়েটা ( জুলেখা) পরিস্কার করে। 

মাছ দিয়ে ভাত খেলে তার পর পান, সুপারি, চুন খাওয়া অত্যাবশ্যক। মুখে পান দিয়ে মায়ের ঘরে যেতে হবে রোজকার নিয়ম। 

কোনো কাজ থাকলে সেটা সমাপ্ত করতে হবে আমায়। 

আর না থাকলে মায়ের মাথায় তেল বসায় দিয়ে চুলে বিলি কেটে দিতে হবে। 

চুলে বিলি কেটে দেওয়ার সময় আমি ঘুমে অনেক সময় ঢলে পড়ি, কিন্তু ঘুমাতে পারি না মা ঘুমাতে না বললে।

মাঝে মধ্যে মা যখন বলে, 'বউ ভালো করে পা ধুয়ে বিছানায় উঠে শুয়ে পড় একসাথে ঘুমাই' ,  তখন কি যে আনন্দ হয় আমার ভিতরে বলে বুঝাতে পারবো না।

কিন্তু আমার মন চায় প্রিয় মানুষটার সাথে দুপুরের পরে বিকেলটা কাটাই। সে সৌভাগ্য আমার অনেক কম হয়েছে, দুপুরে খেয়েই কাজে চলে যান তিনি। বাড়ি থেকে একটু দুরে নিত্য দিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটা দোকান আছে আমার শ্বশুরের।

.

এই দোকানটাই আমার জীবনের সতীনের মত হয়ে গিয়েছে , সারাদিন তিনি দোকানেই পড়ে থাকেন আমার খবর নেওয়ার সময়টুকু তার হয় না ।

আমরা দরিদ্র মানুষ এইচএসসি পরীক্ষার পর আর কলেজের দিকে পা বাড়ানো হয়নি আমার। শুনেছি আমার তিনিও এইচএসসি পাশ করে আর পড়াশোনা করে নাই।

আমার শ্বশুর একদিন রাস্তায় আমাকে দেখে ওনার বড় ছেলের বৌ হিসেবে পছন্দ করেন। কিন্তু আমার শ্বাশুড়ি মা মোটেও রাজি ছিলেন না এই বিয়েতে, তিনি চাইতেন ওনার বোনের মেয়ে এ বাড়িতে বৌ হয়ে আসবে।

শ্বশুর বাবা আর উনিও আমাকে অনেক পছন্দ করায় খুব তাড়াতাড়ি বিয়েটা হয়ে যায় আমাদের। আমার মা বাবার আর্থিক অবস্থা ততটা ভালো নয়, তাই একমাত্র মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে তারা তেমন কোনো ভারি উপহার পাঠাতে পারে নাই। এর জন্য আমার শ্বাশুড়ির মন আরো খারাপ। আশেপাশের মানুষজন বাড়িতে এসে বৌ দেখে মাশাআল্লাহ সুন্দর বৌ হইছে আমাদের পলাশের বলার পাশাপাশি বৌ বাপের বাড়ি থেকে কি নিয়ে আসলো সে কথা জিঙ্গাসা করতে ভুলে না।

.

শ্বাশুড়ি তখন ওনার মুখটা অন্ধকার করে রাখেন, আমাকে মন থেকে মেনে নিতে শ্বাশুড়ি মায়ের অনেকদিন সময় লেগেছিল।

শ্বাশুড়ি মা আমাকে কথা শোনালে আমি সেদিকে কান দিতাম না , এগুলো আমার এখন অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে আর ভাবতাম শ্বাশুড়িরা তো একটু এমন বাঁকা স্বভাবের হবেই ।

বিয়ের প্রথম প্রথম আমার অনেক কষ্ট হইতো এ বাড়িতে, জীবনের প্রথম গৃহস্থ বাড়ির এতো কাজ করা। পনেরো /ষোল জন মানুষের জন্য খাবার রান্না করতে হিমসিম খেতাম আমি।

কিন্তু আমার ভালোই লাগে যৌথ পরিবার, নিজের ভাই বোন নেই জন্য তাদের প্রতি আমার আবেগ অনেক। আমার ছোট ছোট দেবর ননদরা আমাকে অনেক ভালোবাসে আর আমিও তাদেরকে। 

বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে দেখছি এ বাড়ির সবাই মাঠে কাজ করতে যায়, নিজেদের ফসল নিজেরাই ফলায়। আর আমি বাড়িতে বসে রান্না ও অন্যান্য কাজ দেখাশোনা করি।

.

গরমের দুপুরে আমি মানুষটার জন্য লেবু- চিনির শরবত বানায় অপেক্ষা করতাম কখন একটু বাড়িতে এসে আমায় দেখা দিবেন। রোজ না আসলেও প্রায় তিনি বাড়িতে এসে শরবত খেতেন অর্ধেক আমাকে খাওয়াতেন আর খাওয়া শেষে যখন আমার কপালে ঠোঁটের ছোঁয়া এজ নিমিষেই সারাদিনের সকল ক্লান্তি নিমিষে চলে যায় আমার।

এখন তো উনি দোকান নিয়ে ব্যস্ত আর বাকিরা মাঠে ফসল ফলানোর কাজে। মা ছেলেপুলেরা এখন বাড়িতেই থাকেন।

আমি পান চিবচ্ছি আর শ্বাশুড়ির মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছি।

.

শ্বাশুড়ি মা : 'বৌ আমি নাতি নাতনীর মুখ কি মরার পরে দেখবো? তোমাদের বিয়ে হয়েছে তো তিনটি বছর হয়ে গেল ।'

আমি: 'মা আল্লাহ না দিলে আমরা কি করবো আর, '

শ্বাশুড়ি মা : 'আল্লাহ না দেয় মানে এসব তুমি কি বলতেছ বৌমা আমাদের সময় তো বিয়ার বছর ঘুরতেই কোল ভইরা যাইতো সবার ।'

আমি কিছু না বলে চুপ থাকি, উনি বাড়িতে আসলে রাতে সবকথা জানাই ওনাকে। উনি ডাক্তারের কথা বলেন কি সমস্যা জানা দরকার বলে। 

কিছুদিন পর ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু আমার শাশুড়ি মা আমাদেরকে যেতে দিচ্ছে না। ডাক্তারের কাছে যাওয়া নাকি আল্লাহকে ছাড়া কাজ।  

এখন বাচ্চার জন্য অনেক খারাপ কথা শুনতে হয় ঘরে বাইরে আমার, আগের সবকথা সহ্য হলেও বাচ্চা নিয়ে কোনো কথা আমি সহ্য করতে পারি না চোখ থেকে নিজের অজান্তেই পানি পড়ে।

দুঃখ কষ্ট মিলিয়ে ভালোই যাচ্ছিল আমাদের দিনগুলো। কিছুদিন পরে শাশুড়ি মা যখন উনার এক বোনের মেয়েকে এই বাড়িতে এনে দেখেছেন, তখন অনেকের কাছে শুনতে পাই তিনি নাকি তার ছেলেকে আবার বিয়ে করাবেন নাতি নাতনির মুখ দেখার জন্য। 

কান্না থামাতে পারিনা আমি এই কথা শুনে, মেয়েমানুষ যে তার স্বামীর পাশে নিজের ছায়াটাকেও সহ্য করতে পারে না। আমি কিভাবে একটা জীবন্ত মেয়ে মানুষ কে সহ্য করবো ওনার পাশে।

আজ রাতে অনেক কান্নাকাটি করে মায়ের ওনার দ্বিতীয় বিয়ে করানোর কথা বলি। আমাকে মাথায় হাত দিয়ে শান্তনা দেন তিনি। আমি বুঝতে পারি না কি হবে উনি তো মায়ের বাধ্য ছেলে অনেক, তাই ভয় হয়।

আরো কয়েকদিন পর মা ওনাকে বিয়ের কথা বললে উনি চুপ থেকে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলেন। আমি ঘরের দরজার খিল দিয়ে বালিশ ভেজাচ্ছি। 

কিছুক্ষণ পর উনি এসে আমাকে ব্যাগ গুছাতে বলে, আমিও কিছু না ভেবে ব্যাগ গুছাই।

বিকেলবেলা দু'জনে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসি, আসার সময় শ্বাশুড়ি মা কে বলার জন্য অনেক খুঁজলেও পাইনা।

প্রথমে আমার বাপের বাড়ি আসি সেখানে কয়েকদিন থাকি। এরপর উনি শহরের কাছে একটা ঘর ভাড়া নেন দুজনের থাকার জন্য আর একটা দোকানের দেখাশুনার কাজ পায়। যা আয় হবে তা দিয়ে আমাদের দু'জনার ভালোই চলে যাবে দিন।

'

'

ছয়মাস হয় আমার ভিতরে নতুন প্রাণের আগমন ঘটে,ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলার ফলে । আমি বাড়িতে যেতে চাইলেও তিনি যেতে দেননা। শ্বাশুড়ি নাকি অনেক বেজার হয়ে আছেন আমার উপর, আমি নাকি ওনার ছেলেকে ফুসলিয়ে বাড়ির বাইরে নিয়ে আসছি ওনার ধারণা এটা ।

কিন্তু আলাদা থাকার ব্যাপারে আমি শুরুতে কিছু না জানলেও সব দোষ শ্বাশুড়ি মা আমাকেই দেন। ও বাড়ির সবার কথা খুব মনে পড়ে আমার, বিশেষ করে শ্বাশুড়ি মায়ের সাথে দুপুরে ঘুমানো আর পান খেয়ে মাথায় তেল দেওয়াটা। আমার মাথায় তেল না থাকলে তিনি ধরে তেল দিয়ে দিতেন। 

আমি যখনই ওই বাড়িতে যেতে চাই তখনই শনি শাশুড়ি আমাকে নিষেধ করে। সরাসরি মায়ের করা নিষেধ আছে আমি যেন এখন ওই বাড়িতে না যাই  এটা শুনে আমি মনে মনে একটু কষ্ট পাই। 

উনি ও বাড়িতে গেলেও আমাকে নিতেন না আর শান্তনা দেন সবসময় এই বলে একদিন সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমি মা হতে চলেছি শুনেও শ্বাশুড়ি আমার খোঁজ নেয়নি , অন্য সবাই মোবাইলে কথা বলছে আর শ্বশুর বাবা দুবার চুপ করে এসে দেখে গেছেন আমায়, পাছে শ্বাশুড়ি জানতে পেরে না একটা ঝগড়া বাধায় এই ভয়ে।

-- " আচ্ছা মায়ের রাগ কি এখনো পড়ে নাই, চলেননা ও বাড়িতে যাই একলা একলা থাকতে আমার অনেক খারাপ লাগে, সবকিছু শূন্য মনে হয়। "

উনি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন পরে বলেন এই সময় আমার গাড়িতে উঠা বারণ আছে, এই ভাড়া বাড়িতেই থাকতে হবে আমার।

আরো অনেকদিন চলে যায়, 

এদিকে আমার সময়ও ঘনিয়ে আসে। আমার মা এখন সবসময় আমার পাশে থাকেন। আজ রাতে প্রচন্ড পেটে ব্যাথা হয়, এতো ব্যাথা মনেহয় পৃথিবীতে আজি আমার শেষ দিন। ফজরের আগে আগে এক কন্যাসন্তান হয় আমাদের। 

আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েই আছি,

হঠাৎ চোখ খুলে দেখি আমার শ্বাশুড়ি মা আমার মেয়ে কে কোলে নিয়ে হাসছে আবার কাঁদছেও। বলছেন, 

-- " বিয়াইন আপনি সবকিছু গুছিয়ে নেন, আমার বংশের মেয়ে বড় হবে তার নিজের  বাড়িতে। "

(সমাপ্ত)



------------------------------

গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন। আর কমেন্টে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন