আমার শাশুড়ির মতো এতেটা সফল মা পৃথিবীতে আমি আমার জীবনে আগে কখনে দেখিনি। আবারও বলতেই হয় আনাকে মা হিসাবে সফল তিনি, স্বার্থক তিনি।
আম্মা অসুস্থ। বয়স হয়েছে। বার্ধক্য এসে তাঁর শরীরে মনে গ্রাস করেছে।
নিজের হাতে খেতে কষ্ট হয়, একা একা হাঁটেতে পারেন না। গোসল করিয়ে দিতে হয়, অজু করিয়ে দিতে হয়, ওয়াশরুমে গেলে পরিষ্কার হওয়ার জন্য পানি ঢেলে দিতে হয়।
উনার পাঁচ ছেলে, তাদের সককেট বউ এবং নাতি/নাতনি সব সময় খাড়া আম্মার সেবা করার জন্য।
হুমাইরার আব্বু আজ এক বছর আম্মাকে তিনবেলা নিয়ম করে নলা দিয়ে খাবার দেয়।
বিগত বিশ বছর নিঃসন্তান থাকা মায়ের সন্তান হলেও এতো যত্ন করে সন্তানকে খাওয়ায় বলে মনে হয় না ।
হুমাইরার আব্বু কোনো ধরনের বিরক্তি বা অস্বস্তি ছাড়া যেভাবে যত্ন করে আম্মাকে খাইয়ে দেয়। আমি মাঝেমধ্যে জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে এমন স্বর্গীয় দৃশ্য দেখি।
একজন আশি (৮০) বছর বয়সের মা তাঁর ছেলের হাতে খাবার খাচ্ছে।
মনে হচ্ছে আম্মা নয় মাসের শিশু আর হিমেল চব্বিশ বছরের মা।
.
আম্মা ইদানিং প্রায় কাপড় নষ্ট করে ফেলেন। তিনি বিব্রত হন, অপ্রস্তুত হন, ছেলেরা শুনলে কি মনে করবে ভেবে লজ্জিত হন।
শুধু প্রস্রাব করে কাপড় নষ্ট নয়, পায়খানা করেও কাপড় নষ্ট করে ফেলেন।
ঘরে আমরা পাঁচ বউ আছি, বড়ো একটা নাতনি আছে, কাজের বুয়ারা আছে সবাই শ্রদ্ধাভরে আম্মা সেবা করার জন্য প্রস্তুত। অথচ আম্মা পায়খানা করলে আমার ছোট ভাসুর নিজ হাতে এসে পরিষ্কার করেন।
যদি সম্ভব হতে তাহলে হয়তো তাহলে তিনি নিজেই ওয়াশরুমে মাকে নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে আনতেন।
ভাইয়া যখন মনের নিজ ইচ্ছেতে আনন্দে স্বেচ্ছায় এসে টিস্যু দিয়ে আম্মার পায়খানা পরিষ্কার করেন , তখনি মনে হয় এমন সৌভাগ্যবান মা হওয়া খুআ কঠিন , এমন সন্তান পেটে ধারন করা সত্যি অনেক ভাগ্যের ব্যাপার যা সবার ভাগ্যে থাকেনা ।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি আমরা পাঁচ জা একসাথে এক ঘরে থাকি, এক পাতিলে রান্না খাবার খাই। আমি ছোট বউ। আমার বিয়ের বয়স দশ বছর। বড় ভাসুরের বিয়ের বয়স পঁচিশ বছর।
আম্মার খুশির জন্য তাঁর ছেলেরা আরও একশ বছরও একসাথে থাকতে প্রস্তুত।
পরবর্তী প্রজন্ম নিয়েও প্রয়োজনে একসাথে থাকবে।
এই একসাথে থাকা নিয়ে আমাদের কারো মধ্যেই কোনো অভিযোগও নেই, আবার কারো কষ্টও হচ্ছে না আমরা খুব হ্যাপি ।
অথচ গতকয়েকদিন আগে একটা নিউজ দেখলাম। লক্ষ্মীপুরের এক বৃদ্ধ বাবাকে সেবা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর তিন ছেলে বাবাকে বাড়ির বাইরে উঠানে ফেলে রেখেছে।
এভাবে প্রতিদিন আট নয় ঘন্টা বাইরে পড়ে থাকার পর স্থানীয় প্রশাসনের লোকজন এসে তাঁর বড়ো মেয়ের দায়িত্বে বাবাকে দিয়েছে।
অথচ বিলাসবহুল অট্রালিকায় তিন প্রতিষ্ঠিত ছেলের ঘরের এক কোণে বাবার জন্য সামান্যতম ঠাঁইটুকুও হয়নি।
আমার নানু ভীষণ অসুস্থ। তিনি চারজন প্রতিষ্ঠিত ছেলে ও দুইজন সামর্থবান, স্বচ্চল মেয়ের মা। তিনি একজন সরকারি স্কুল শিক্ষকের স্ত্রী। যিনি এখনো আট হাজার টাকা পেনশান পান।
অথচ এই অসুস্থ মায়ের দায়িত্ব দূরের কথা কোনো সন্তান ব্যস্ততার অজুহাতে উঁকি দিয়ে দেখে যেতেও রাজি না তাদের মাকে ।
অথচ এই মহিলা যখন বিধবা হন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ত্রিশ বছর। তিনি স্ট্রাগল করে চারজন ছেলেকে স্নাতক পাশ করিয়েছেন।
ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। অথচ মায়ের জায়গা বড্ড কম হয়ে গেছে তাদের সংসারে।
আমার দাদা প্রায় একশ কানি সম্পত্তির মালিক ছিলেন। তিনি বিপত্নীক হয় একাএকা ষোলো বছর ছিলেন। বিয়ে করার অনেক সুযোগও প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন, শুধু ছেলেদের সম্পত্তির ভাগিদার বাড়াতে চাননি।
অথচ তাঁর মৃত্যুর পূর্বের রাতে ছেলেরা বৈঠক করেছে, বাবার দায়িত্ব কে নেবে?
বড়ো বলে মেজো, মেজো বলে ছোট, ছোট বলে বড়ো। মোটকথা কেউ বাবার দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। কারণ তিনি বিছানায় প্রস্রাব,পায়খানা করেন। কে কত দিন দায়িত্ব নিয়েছে, তার হিসাব কষতে বসে যায়। সবার সব হিসাবে থু দিয়ে এর পরেরদিননই তিনি মারা যান।
এখন আমরা সবাই জেগে বসে আছি। আম্মা অসুস্থবোধ করছেন।
ছেলেরা মাকে ঘিরে বসে আছে। আজ সারা রাত সবাই ঘুমালেও ছেলেরা ঘুমাবে না। কেউ মায়ের পায়ের তালুতে চুমু দেয়, কেউ হাতে, কেউ কপালে, কেউ পিছন দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে।
আমার মনে হয় সন্তান শুধু বড়ো বড়ো ডিগ্রীধারী হলেই স্বার্থক বাবা-মা হওয়া যায় না।
বাবা -মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা যদি সন্তানের না থাকে, বৃদ্ধ বয়সে যদি বাবা- মায়ের দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে বড়ো বড়ো অফিসারের বাবা- মা হলেও তাঁরা কিন্তু ব্যার্থ।
-------
ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন। আর কমেন্টে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না।🥰


