≈ গল্পঃ আমাদের সংসার ≈ সূচনা পর্ব - [ ০১ ]

 




≈ গল্পঃ আমাদের সংসার ≈

সূচনা পর্ব - [ ০১ ]


বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে দেশে আসতেই বাবার চাপের মুখে বিয়ে করতে বাধ্য হলাম আমি । সদ্য বিধবা হওয়া বড় ভাইয়ের স্ত্রী নীরাকে। 

বাবা এমনটা করবে জানলে বাংলাদেশেই আসতাম না। নিজেকে গুছিয়ে নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই এতো বড় একটা ঝড় বয়ে যাবে জীবনের উপর দিয়ে ভাবতেই পারিনি। আট মাস আগেই ভাইয়া নীরাকে বিয়ে করে, এর দুই মাস পরেই আমি বিদেশে চলে যাই। নীরাকে কখনোই আমি এভাবে দেখিনি। সব সময় বড় ভাইয়ের স্ত্রীর চোখেই দেখেছি যদিও বয়সে সে আমার অনেক ছোট। কিন্তু কখনোই ভাবতে পারিনি আমার জীবন সঙ্গী তাকে করবো।

কিন্তু বাবার সম্মানের দিকে চেয়ে সব মেনে নিতে বাধ্য হলাম। বাসর ঘরে নীরা একা বসে আছে, আর আমি ছাদ এ বসে ভাবছি আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেল এভাবে। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে, না তা হতে দিবো না। আমি এবার বিদেশে চলে গেলে আর আসবো না।আর নীরাকে কোন ভাবেই স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারবো না। 

রাত প্রায় দুইটা বেজে গেছে, 

আমি নিচে নেমে যেয়ে দরজাটা খুলতেই দেখি নীরা বসে বসে কাঁদছে।আমাকে দেখেই নীরা খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে গেল, এবং বলতে শুরু করলো,

- " কি সম্ভব হয় তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন , আমার জন্য হয়তো আজকে আপনার এই পরিস্থিতি । আমি এটাও জানি আপনি হয়তোবা কোন দিনও আমাকে মন থেকে ভালবাসতে পারবেন না। আর এটা হওয়াই স্বাভাবিক, অন্যকেউ হলেও মেনে নিতে পারতো না। তাই আমি কখনো কোন প্রকার অধিকার খাটাতে আসবো না। আপনি আপনার মত চলতে পারেন যেমন খুশি ঠিক তেমন করে। "

বলেই নীরা খাটের উপর উঠে এক কর্ণারে শুয়ে শুয়ে কান্না করতে থাকলো।

আমি আর কিছু বললাম না, প্রচন্ড রাগ নিয়ে বারান্দায় চলে যেয়ে একের পর এক সিগারেট টানছি।দেখতে দেখতে যে কখন রাত শেষে ভোর হয়ে এলো বুঝতেই পারিনি। নীরা বিছানা থেকে উঠে ফ্রেশ হতে চলে গেলে আমি যেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি, চোখে ঘুম ঘুম লেগে আসতেই আমি দেখি নীরা ওযু করে এসে নামাজ পড়তে বসেছে। আমি আমার মত দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে গেলাম।

এগারোটার দিকে মায়ের ডাকে ঘুম থেকে উঠে, ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে যেয়ে দেখি নীরা নাস্তা রেডী করছে। প্রচন্ড রাগ নিয়ে কোন রকমে নাস্তা করে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। মনের ভিতর আগুন জ্বলছে কোন ভাবেই ঘরে মন টিকানো সম্ভব না।

মনে মনে ভাবছি যেয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় পার করে দিবো, যে কয়দিন বাংলাদেশে আছি। রাত করে বাড়ি ফিরবো যখন নীরা ঘুমিয়ে পড়বে ওর মুখটাও আমার দেখতে ইচ্ছে করে না কেন জানি। ভাবতে ভাবতেই বন্ধুদের মাঝে চলে গেলাম। যেতেই বন্ধুরা বিভিন্ন রকম মন্তব্য করতে শুরু করলো, সরাসরি বলতে শুরু করলো, ‘কি বন্ধু কেমন রাত কাটলো, ভালইতো পেয়েছিস ভাবীকে।’ আরও অনেক রকম বাজে কমেন্টস করতে শুরু করলো।

ওদের কথায় মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল। ওদের সাথে তেমন কোন কথা না বলেই সেখান থেকে উঠে চলে আসলাম।নিরিবিলি একটা জায়গা দেখে বসে পরলাম। পকেট থেকে ফোনটা বের করে ডাটা কানেকশন অন করতেই ম্যাসেঞ্জারে টুংটাং শব্দ করে দিয়ার ম্যাসেজ আসতে শুরু করে দিয়েছে।

দিয়ার সাথে বিদেশে থাকা অবস্থা থেকেই ফেসবুকে পরিচয়, কিছু দিনের ভিতরেই আমাদের সম্পর্কটা ভালোবাসায় রূপ নেয়। আমি কখনো বিশ্বাস করতাম না যে ভার্চুয়ালে ভালোবাসা হতে পারে, কিন্তু দিয়া তা ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। ও আমাকে ফোনের অন্যপ্রান্ত থেকে এমন ভাবে কেয়ার করেছে যে মনে হতো সব সময় আমার পাশেই ছিল। এতো হাজার মাইলের দূরত্বকেও তখন দূরত্ব মনে হতো না।

ব্যস্ততার জন্য এই কয়েকদিনে মেয়েটাকে ম্যাসেজ দিতেই পারিনি, না জানি কত কিছু ভেবে বসে আছে। ভাবতে ভাবতে ম্যাসেজ ওপেন করতেই দেখি দিয়ার অভিমানী ম্যাসেজ, 

- " কি আমাকে ভুলে গেলে বাংলাদেশে এসেই? তুমি না বলেছিলে সব কাজ শেষ করেই আমার সাথে দেখা করবে কই তুমিতো এলেনা। আসবেতো দূরের কথা, না একটা ম্যাসেজ না কোন কল, তুমি কি ঠিক আছো? "

আমি আর দেরি না করে দ্রুত ম্যাসেজ ব্যাক করলাম, 

- " হুম আমি ঠিক আছি একটু ব্যস্ত ছিলাম বুঝইতো তুমি। চলো আজ এক সাথে লাঞ্চ করবো " 

মেসেজ দিয়ে বসে আছি কয়েক মিনিটের ভিতরেই দিয়ার রিপ্লাই আসলো,

- হুম চলে আসো "

ঠিকানা দিয়ে দিলো, আমি বললাম, 

- " ঠিক আছে তুমি আসো আমি আসতেছি "

বলেই সেখান থেকে উঠে রওনা দিলাম দিয়ার সাথে দেখা করার জন্য। মনে মনে ভাবছি দিয়াকে কি নীরার কথা বলবো? না ওকে কিছুই বলা যাবে না, কিছু দিনেরইতো ব্যাপার বিদেশ যেয়েই নীরাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো, অযথায় ওকে বলার কি দরকার।

অল্প সময়ের ভিতরেই দিয়ার পাঠানো ঠিকানায় চলে আসলাম, ঠিক সময় মত দিয়াও চলে আসলো। এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো। দিয়া আধুনিক মর্ডান মেয়ে, জিন্স টপ পড়ে এসেছে। ছবিতে ওকে যতটা সুন্দর লাগে তার চেয়ে অনেক বেশী সুন্দর আর স্মার্ট মেয়ে দিয়া। যেকোন ছেলেই পছন্দ করতে বাধ্য হবে।

দিয়াকে যতই দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি মনে হচ্ছেই না আজ আমাদের প্রথম দেখা সরাসরি। মনে হচ্ছে যুগযুগের চেনা। নিমেষেই এই কয়েকদিনের যন্ত্রনা যেন ভুলেই গিয়েছি আমি।

খুব দারুণ ভাবে প্রতিটা মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে দিয়ার সাথে দুপুরের লাঞ্চ রাতে মুভি দেখা, ডিনার করা, কেমন করে যেন সময় গুলো কেটে গেল। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে দিয়াকে বিদায় দিয়ে বাড়ির উদেশ্য রওনা হলাম। মনটা আবারও খারাপ হয়ে গেল, বাসায় যেয়ে আবার ও নীরার মুখ দেখতে হবে, অসহ্য একটা মেয়ে, দেখার সাথে সাথেই মনটা খারাপ হয়ে যাবে।

রাত ১২টার দিকে বাসায় আসলাম, 

কয়েকবার কলিং বেল টিপ দিতে নীরা এসে ঘরের দরজাটা খুলে দিলো।শরীরে শাড়ি ঠিক মত নেই। মনে হয় ঘুমিয়েছিলো। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে মুখের সাথে লেপটে ছিল, আমি কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। 

আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে চোখ নামিয়ে নিলো, সে মুহূর্তে আমার খুব ইচ্ছে করছিল তার মুখ থেকে চুল গুলো সরিয়ে দিতে, এক অন্যরকম মাদকতায় সে মুহূর্তে আমাকে পেয়ে বসেছিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে আমি ঘরে ডুকে গেলাম।

এসব আমি কি ভাবছি, না এগুলা ভাবা মোটেও আমার ঠিক হচ্ছে না। কোন ভাবেই আমার নীরার প্রতি মায়া বাড়ানো যাবে না। আমি দিয়াকে ভালোবাসি আর বাংলাদেশ থেকে চলে গেলেই নীরাকে ডিভোর্সের পেপার পাঠিয়ে দিবো। ভাবতে ভাবতে ওয়াশ রুমে চলে গেলাম। 

ফ্রেশ হয়ে আসতেই নীরা বললো, 

- " টেবিলে খাবার দিয়েছি দয়া করে খেয়ে নেন । "

আমি বললাম, 

- " আমি খেয়ে এসেছি "

নীরার মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল, সে কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল। তারপর খাবার গুলো ঢেকে রেখে এসে বিছানার এক কর্ণারে যেয়ে শুয়ে পড়লো।

আমি আমার মত বিছানায় শুয়ে শরীরে চাদর টেনে নিলাম। কি করবো ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। গভীর রাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায় আমি লক্ষ করি নীরার দুটি হাত আমার শরীরের লাগলে আমি বুঝতে পারি সে শীতে কাঁপছে , আমি তার  হাত দুটি নামিয়ে দিয়ে চাদরটা তার গায়ে টেনে দিয়ে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকাতেই অনুভব করলাম  ঘুমন্ত নীরাকে সত্যিই অনেক রূপবতী লাগে । ঘুমন্ত সব মেয়েকেই শোনেছি রূপবতী লাগে আজ বাস্তবে তা দেখলাম।

নীরার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে খেয়ালই করি নেই। নীরা ভোরে ঘুম থেকে উঠতেই আমি দুচোখ বন্ধ করে নিলাম। যেন নীরা কোন কিছু না বুঝতে পারে। নীরা আলমারি থেকে শাড়ি নিয়ে চলে গেলো গোসলের জন্য ওয়াশরুমে। 

কিছু সময়ের ভিতরেই  নীরা গোসল করে বের হয়ে আসতেই আমি উঠে বসলাম। নিজে ফ্রেশ হবার জন্য, ফ্রেশ হয়ে এসে নীরার দিকে তাকাতেই আমার চোখ আটকে গেল।

নীরার ভেজা চুল বেয়ে পানি পরছে, সূর্যের আলোয় অন্যরকম সুন্দর লাগছে নীরাকে। শাড়িতে যে একটা মেয়েকে এতো সুন্দর লাগতে পারে নীরাকে না দেখলে কখনোই বুঝতে পারতাম না। আমাকে নীরা এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলো, 

- " কিছু বলবেন? " 

আমি তার কথায় থতমত খেয়ে গেলাম। আমি কোন কথা না বলে সোজা ওয়াশ রুমে চলে গেলাম।

চলবে.....

----------------------

---------------------------------

(৩/৪ পর্বে সমাপ্ত হবে গল্পটা। সবাই রেসপন্স করবেন কমেন্টে।পরবর্তী পর্ব পোস্ট করা হলে কমেন্টে দিয়ে দেওয়া হবে।ধন্যবাদ)

6 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন