' আন্টি আমার টিউশনির টাকাটা যদি… '
- ' রায়হান তুমি সব সময় এত টাকা টাকা করো কেন বলো তো ? এত অভাব আর এতো তাড়ানিয়ে তো ঢাকা শহরে টিকতে পারবা না বাবা। '
- ' না মানে আন্টি মেস ভাড়া বাকি পড়ে গেছে…
আমার বাড়ির অবস্থা তো আপনাকে বলেছি আন্টি! '
- ' দিলা তো মেজাজটা খারাপ করে।সন্ধ্যায় তোমার আঙ্কেল সহ আপন জুয়েলার্সের হালখাতায় যাব।ওখানে লাখ পাঁচেক টাকার একটা ডিউজ আছে-আজ এক বছর। নেহায়েৎ তোমার আঙ্কেলের ঘনিষ্ঠ বলে রক্ষা।আজ হালখাতার দিন;পুরো ডিউজ ক্লিয়ার না করলে সবার সামনে তোমার আঙ্কেলের ইজ্জত থাকে বলো? '
রায়হানের বুক ফেটে কান্না আসে।সংসারের এসব 'অভাবী'লোকগুলোর সাথেই কেবল ঘুরে ফিরে তার দেখা হয়।গরীবের দুঃখ শুধু গরীবেই বুঝে।ধনীরা কেবল শুনে যায়,আমল দেয়না।
ওর অবস্থা খুবই শোচনীয়,
মেস ভাড়া বাকি,টি স্টলে বাকি,সেলুন বাকি,লন্ড্রী বাকি,টাকার জন্য ঠিকমত জুতা কালি করতে পারছে না।নাম মাত্র পকেট মানির একটা অস্তিত্ব যা ও ছিল তা ও তলানীতে এসে ঠেকেছে।
এক বছরে পাঁ…চ…লা…খ টাকার গহনা বানিয়েছেন জুবাইদা আন্টি? বিষয়টি রায়হানের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে,কি এমন চাকরি করে আঙ্কেল..??সরকারি থার্ড গ্রেডের একজন কর্মকর্তা।আজগর আঙ্কেলের মাসিক বেতন ভাতা কত?পরীবাগে বাইশ শ' স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাট।
স্ত্রী জুবাইদা বিলাশিতা, তার পুত্র মাহির এবং তার নিজের সহ প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা করে এতো দামী গাড়ি সাথে ড্রাইভার,অলটাইম দু'জন মেইড সার্ভেন্টস!এসব ব্যয় মিটানোর অর্থ আসে কোত্থেকে?এ টাকার উৎস-ই বা কি?
গনিতের ছাত্র রায়হান এমন উদ্ভট অংকের ইকুয়েশন করতে পারেনা।তার মাথা ভার হয়ে আসে।এসব কিছুই ঢুকে না তার মাথায়।চুপচাপ মাহিরকে পড়াচ্ছে সে।মাগরিবের আজান হলেই মাহিরের ছুটি।রায়হানও হেঁটে হেঁটে আজিমপুর মেসে চলে যাবে…।
'
'
------
-----------------
আজ সকাল থেকেই জুবাইদা খানমের ব্যস্ততা।আজগর সাহেব অফিশিয়াল ট্যুরে দেশের বাইরে আছেন।এই ফাঁকে পাশের ফ্ল্যাটের ভাবিদের নিয়ে জম্পেশ আড্ডার আয়োজন, সাথে খাওয়া দাওয়া।অনেক দিন ভাবিদের সাথে আড্ডা দেয়া হয়না।
ড্রয়িং রুমে ঝুমুর ভাবি,
নুপুর ভাবি,মহুয়া ভাবিদের বেশুমার আড্ডা চলছে।
সেই আড্ডা ড্রয়িং রুম থেকে বেড রুম,বেড রুম থেকে কিচেন পর্যন্ত বিস্তৃত হল।
আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে সবাই মিলে যৌথ উদ্যোগে রান্না বান্না চলছে।
ভর্তা থেকে বিরিয়ানি,বড়া থেকে বোরহানী কোন কিছুই বাদ যাচ্ছেনা।
দুপুরের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হল,অসময়ের বৃষ্টি!
ঝুমুর ভাবি বললেন,
- ' ইস রে!ভুনা খিচুরির দিন যায় ভাবি! '
- ' তবে তাই হোক! '
জুবাইদা খানম বলেন।
- ' না ভাবি তুমি এটা আমাকে করতে দাও,নইলে আমি কিন্তু রাগ করব। নুপুর ভাবির আবদা এটা '
- ' না না অত সামান্য বিষয় উপর দিয়ে নুপুর তোমায় ছাড়া যাবেনা,তোমার পালা অন্যদিন। '
সবাই হোঃহোঃ করে হেসে উঠলেন।
দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষে সবাই ড্রয়িং রুমে আড্ডা মারছেন।জুবাইদা খানমের রান্না,আন্তরিক আতিথিয়তার প্রশংসা করছেন সবাই।আলাপ,আড্ডা ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।জুবাইদা খানম বৈষয়িক আলোচনার সুত্রপাত করলেন।
- ' বুঝলা ভাবিরা!যা দিনকাল পড়ছে একটু চালাকি করে চললে অনায়াশে অনেকগুলা টাকা সাশ্রয় করা যায়।
- ' সে কেমন? '
সবাই সমস্বরে জানতে চান। '
জুবাইদা খানম মিটিমিটি হাসেন।
- ' বলনা ভাবি…লক্ষ্মী ভাবি। '
- ' গত সপ্তায় আমি আর সাহেব গেছি আপন জুয়েলার্সের হালখাতায় বুঝছ? '
পাঁচ লাখ টাকার দেনা!তোমাদের ভাইতো জানোই একেবারে হাবা।বাধ্য হয়েই ব্যাপারটা আমাকে হ্যান্ডেল করতে হল।সোজা গিয়ে ম্যনেজারকে বললাম,
- ' গরীব হইছি বলে কি আমাদের কোন মান সম্মান নাই? '
ম্যানেজার একহাত লম্বা জিভ বের করে বলেন,
- ' ছিঃছিঃ ভাবি!কি যে বলেন আপনি ,কি হইছে বলেন আমাকে। '
- ' পাঁচ লাখ টাকা দেব কোন ছাড় নাই নাকি ?স্ট্রেঞ্জ! '
- ' আচ্ছা ঠিক আছে ভাবি আমি দেখতেছি আপনার জন্য কি করা যায়। '
- ' কাইন্ড ইনফরমেশন ভাবিগণ,এক ঝাড়িতেই পঁচিশ হাজার টাকা লেস হয়ে গেলো '
- ' বলেন কি!পঁচিশ হাজার? '
- ' জি মাননীয়াগণ।আরেকবার হইছে কি শোন।ফার্নিচারের দোকানে বিরাট বাকি হইল।আমার হাবাগোবা সাহেব টাকাপরিশোধের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।আমি বললাম,
- ' রাখো!বাকি পরিশোধে এত তাড়াহুড়ার কি আছে?আমরা কি বাড়ি ভেঙ্গে চলে যাচ্ছি নাকি? '
- ' না মানে কেমন দেখায়, টাকা থেকেও ঘুরাচ্ছি। '
- ' ধীরে হানি ধীরে…। '
তারপরসমস্বরে জানতে চাইলেন সবাই,
- ' কত? '
- ' পঞ্চাশ হাজার! '
- ' ওয়াওও…! '
---------
-------------------
আজ এক সপ্তাহ রায়হান টিউশনিতে যাচ্ছে না।তার চিকেন পক্স উঠেছে।গায়ে হাল্কা জ্বর সেই সঙ্গে ব্যথা।সারা গায়ে জলঠোসা উঠেছে।সেই জলঠোসায় মাছির উৎপাত ঠেকাতে মশারির ভিতর শুয়ে থাকতে হচ্ছে সারাক্ষন।
রুমমেট আনিস ভাই তারজন্য অনেক করছেন।এই রোগ প্রচন্ড ছোঁয়াচে জেনেও তিনি রুম বা রায়হান কোনটিই ছেড়ে যান নি।
আনিস ভাই মার্কেটের 'দ্য ম্যাজেস্টিক টেইলার্সের'কাটিং মাস্টার।
মধ্য বয়সী অকৃতদার আনিস ভাইয়ের হৃদয় মায়ায় মায়ায় ভরা।পক্স উঠার একদিন পর থেকেই তিনি কাজে যাচ্ছেন না।লজ্জিত রায়হান কাঁচুমাচু হয়।
- ' আনিস ভাই!আমি আপনাকে মহা ঝামেলায় ফেলে দিলাম। '
- ' ধুর মিয়া,স্বার্থপরের মত কথা কইবা না তো।মানুষ মানুষের জন্য এইটা সব সময় মনে রাখবা। '
- ' চিকেন পক্স বড় ছোঁয়াচে রোগ ভাই! '
- ' রাখো তোমার ছোঁয়াচে।আমি বিক্রমপুইরা পোলা;অত ডর ভয় আমার নাই। '
আনিস ভাই কোত্থেকে নিমপাতা আর কাঁচা হলুদ জোগাড় করে এনেছেন আমার জন্য ।
নিজ হাতে বেটে পেস্ট করে রায়হানের গায়ে মাখিয়ে দেন প্রতিদিন।
গরম পানি করে দেন গোসলের জন্য।অনুজতূল্য এই ছেলেটির জন্য তার এত মায়ার কারন তিনি ঠিক বুঝতে পারেন না।
- ' বুঝলা রায়হান!জলবসন্তের মোক্ষম দাওয়াই হইল এইসব কবিরাজি চিকিৎসা।মা চাচীগো দেখতাম…। '
এমন সময় ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেল।এমনিতেই ভাদ্র মাসের তালপাকা গরম।
শরীর ঘেমে আবস্থা খারাপ;এই সময় ইলেক্ট্রিসিটি না থাকলে কার না মেজাজ খারাপ হয় বলেন।
আনিস ভাই হাত পাখা দিয়ে রায়হানকে বাতাস করছেন।মশারির উপর দিয়েই করছেন।ছেলেটার কষ্ট দেখে তার খুব খারাপ লাগছে।
- ' রায়হান!শইল চুলকায়?চুলকাইলে আমারে কইবা হিস্টাসিন এনে রাখছি।
ডিম,দুধ,ফল ফ্রুটসও আনা আছে খাইতে মন না চাইলেও একটু জোর কইরা কইরা খাইবা।এইসব রোগে ভালমন্দ খাওন লাগে।রাইতে কি খাইবা কও।নতুন কিছু খাইতে মন চায়? '
অন্ধকার মেস ঘরে আনিস ভাইর হাতপাখা চলছে।ক'দিনের জ্বরে রায়হানের মুখের রুচি চলে গেছে।
বাড়িতে হলে মা এটা সেটা তৈরী করে মুখের সামনে ধরতেন।এটাতো আর নিজ বাড়ি না-ঢাকার মেস।এই শহরে সে কাউকে তেমন একটা চিনে না।
রায়হানের প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে।একটু পোলাওর চালের জাউ আর খাসির ভুড়ি ভুনা খেতে ইচ্ছে করছে খুব।আনিস ভাইকে কি করে বলবে যে তার জাউ খেতে ইচ্ছে করছে!
- ' অই মিয়া রায়হান!জাউ খাইবা?পোলাওর চালের জাউ,ডিম ভাজি দিয়া? '
আনন্দে রায়হানের চোখে জল এসে গেল।কাকতালীয় বুঝি একেই বলে!
- ' খুব মন চাইছে ভাই।সাথে যদি একটু বট ভুনা হইত তাহলে খুব ভালো হতো-
পেটটা ভরে খাইতাম। '
- ' খাড়াও আমি জাউডা চুলায় বসায়া দিয়া পলাশী মোড়ের ভ্যান থেইকা এক প্লেট ভুনা বট নিয়া আসতাছি।খাইবা মিয়া, পেট ভইরা খাইবা! '
শুয়ে থাকা রায়হানের দু'চোখ বেয়ে ক'ফোঁটা গরম জল গড়িয়ে পড়ে।আনিস ভাইয়ের কাছে অনেক দেনা জমে গেছে, কিভাবে যে শোধ করবে কে জানে!
টিউশনির টাকাটা পাওয়া যায়নি এখনো।চার মাসের টিউশনির টাকাটা একসাথে পাওয়া গেলে টুকটাক ঋনগুলো সব শোধ করে ঝরঝরে হওয়া যেত!ভাল মন্দ ফল ফ্রুটস কিনে খাওয়া যেত।
জুবাইদা আন্টিকে ফোনে বলা হয়েছে সব।তারপরও তিনি টাকাটা দিচ্ছেন না।
তার ঘুরাতে লজ্জা লাগেনা রায়হানের চাইতে লজ্জা লাগে।
প্রবাদ আছে ‘ব্যাড ডেইজ নেভার কাম এলোন’।তার এখন দুঃসময় চলছে।
রায়হানদের গ্রামের বাড়ির অবস্থা তেমন ভালো না।
যে টিউশনির টাকায় ঢাকা শহরে তার পেট চলে,সেটিই আটকে আছে আজ চার মাস।নতুন টিউশনি না পাওয়া অবধি এটি ছাড়াও যাচ্ছে না।
জল বসন্তে আক্রান্ত রায়হান ধীরে ধীরে দুঃশ্চিন্তা আর হতাশার এক গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়…!
-------
-----------------
জুবাইদা খানম ড্রয়িংরুমে বসে পাক ভারত ওয়ান ডে ম্যাচ দেখছেন।খেলা প্রায় শেষ পর্যায়ে।শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা।ব্যাটিংয়ে পাকিস্তান।চার বলে ছয় রান দরকার।
প্রথমটা নো বল হল।দ্বিতীয় বলেই ছক্কা!
ছ…ক্কা…!
এমন সময় ডোর বেল বেজে উঠল।কপালে ভাঁজ নিয়ে জুবাইদা খানম মেইন ডোর খুললেন।
- ' আরে রায়হান-তুমি?কই ছিলা এতদিন? '
রায়হান কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আন্টির দিকে তাকিয়ে রইল।
- ' আন্টি আমার চিকেন প…… '
- ' ওহ সরি আমার মনে ছিল না ,তুমি তো মোবাইল করছিলা! '
- ' আন্টি আজ কি আমার টিউশনির টাকাটা দেওয়া যাবে আমার খুব প্রয়োজন ?দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমার।বিশ্বাস করেন আন্টি আমার বাবা একজন ভুমিহীন বর্গাচাষী।তিনি আমায় ঢাকায় পড়াতে রাজী ছিলেন না।তার চোখে এটা গরীবের ঘোড়া রোগ!আজ আমি স্বীকার করছি বাবার কথাই ঠিক।সত্যি এটা গরীবের ঘোড়া রোগ।
আন্টি আমার চার মাসের টিউশনির বিশ হাজার টাকা,আজ এক মুঠে এই মুহুর্তে যদি দেন আমি পনের হাজারেই রাজী।সব শোধ বোধ বাকি টাকা আর দিতে হবে না। '
- ' রায়হান ইউ আর য়্যা গুড বয়,কাম ইন! '
রায়হানকে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রেখে জুবাইদা খানম ভিতরে চলে গেলেন।ভিতর ঘর থেকে সেগুন কাঠের লাক্সারী আলমিরা খোলার মৃদু শব্দ ভেসে এল।
- ' এই নাও রায়হান!পনের হাজার টাকাই ছিল ঘরে!সয়্যার আপন গড!এই ভাঙ্গা মাসে আর আসার দরকার নাই।একবারে মাস পয়লা থেকে আবার শুরু কইরো।চা খাবা?খাইলে বস।আমার আবার দেরি হয়ে যাচ্ছে।পাঁচতলার ভাবির ফ্ল্যাটে দ্বীনি আলোচনা আছে;প্রতি মাসের তৃতীয় বৃহস্পতিবার হয়!শুনতে কি যে ভাল লাগে! এসব দ্বীনি বিষয় আলোচনা শুনলে মনটা রাহিম অজান্তেই নরম হয়ে যায়। '
রায়হান আন্টির দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।
তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে,
– ❝ হে অনন্ত নীলাকাশের মালিক ইহাদের অন্তর তুমি সত্যি সত্যি নরম করিয়া দাও! ❞
.(সমাপ্ত)
--------------------------
#ছোটগল্প
#হালখাতা
----------------------------------
গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন। আর কমেন্টে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না।🥰



Thank you for shedding light on this important issue. Informative and eye-opening!
উত্তরমুছুনThe weekly roundup is a convenient way to stay in the loop.
উত্তরমুছুন"The product comparisons on this website helped me make an informed decision. They were detailed and comprehensive."
উত্তরমুছুনIn your element 🔥
উত্তরমুছুন"The 'Interactive Polls' feature adds an element of gamification – engaging users in a fun and interactive way."
উত্তরমুছুন"Your website feels like a friendly conversation – genuine and uplifting."
উত্তরমুছুন