≈ গল্পঃ মাইশা মৃত্যু ≈ পর্ব - [ ০৪ ]

 





≈ গল্পঃ মাইশা মৃত্যু ≈

পর্ব - [ ০৪ ]


--------------------------------

নাঈমা এমন করবে আমি বুঝে উঠতে পারিনি। আমি সাথে-সাথে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আতঙ্কের সাথে বললাম,

- আর এ কি হলো? পা ধরতেছো কেন?

নাঈমা কান্না মাখা গলায় বলে,

- দুলাভাই আমার খুব ভয় করছে। আমি ভয়ে এই দুই দিন বাইরে যাই না। আব্বু, ভাইয়া কে বলে কোন কাজ হবে না।আপনি একটু কিছু করেন প্লিজ। একটু আগে আবার কল আসছিলো একটা অপরিচিত নম্বর থেকে।আমি কেটে দিয়েছি।

আমি অনুভব করলাম নাঈমার হাত দুটো কাঁপছে। আসলেই তো মেয়েটা অনেক ভয় পেয়েছে।

আমি অনেকটা স্বাভাবিক স্বর নিয়ে ওকে বললাম,

- তোমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করা তো আমার কর্তব্য। এটার জন্য পা ধরার কি আছে হ্যা? 

এই বলে নাঈমার দুই বাহু ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলাম।বললাম,

- আমি দেখছি কি করা যায়। তোমার কোন ভয় নেই। বুঝলে?

হঠাৎ নাঈমা আবদার করে বললো,

- আমি আপনার সাথে যাবো দুলাভাই।

এই কথা শুনেই আমি বড়বড় চোখে তাকিয়ে পড়লাম। মেয়েটা কি বলছে ওর হুশ নাই।

আমি বললাম,

- উফফ কি সব ছোট মানুষের মত কথা বলছো। তোমার আপু এখন আর নেই। আমি বাসায় একা থাকি। এখন বলো তোমাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?এতো বড় হয়েছো এগুলা বুঝোনা কেন?

নাঈমা আহত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওর চোখেমুখে দেখলাম চরম ভয়ের ছাপ।

কান্না জড়ানো কণ্ঠে নাঈমা বললো,

- কিন্তু দুলাভাই ...

আমি ওকে চুপ করিয়ে বললাম,

- আহা.. বললাম তো আমি আছি। কিচ্ছু হবে না তোমার। সেখানে তোমার আপু রে'প হয়ে খুন হয়েছে আর তুমি সেখানে যেতে চাও?

নাঈমার কাধে হাত রেখে শান্তনা দিয়ে বললাম,

- শুনো.. এই কয়দিন তুমি বাসায় থাকো।আমি নম্বর গুলো নিয়ে পুলিশে দিবো।

কোনরকমে বুঝিয়ে শান্ত করলাম নাঈমা কে।

.

.

সাতক্ষীরা থেকে মাত্রই বাসায় ফিরলাম।বাসায় ঢুকার আগে কাদের ভাইয়ের বাসার দরজায় নক দিলাম। দেখলাম ভাবী দরজা খুললেন।বললাম,

- কাদের ভাই বাসায় নেই ভাবী?

- এখন তো বেলা ১২টা বাজে। অফিস টাইম। ও অফিসে আছে।

- ওহ আচ্ছা।

এই বলে একটু ভেবে আবার বললাম,

- আচ্ছা ভাবী শুনলাম আমার বাসার পেছনের দিকে নাকি ৩ বছরের একটা বাচ্চার লাশ পাওয়া গিয়েছে।

ভাবী দেখলাম বেশ আগ্রহ নিয়ে বলছে,

- হ্যাঁ স্বপ্নীল ভাই। আপনি যে সকালে সাতক্ষীরাতে গেলেন আর পুলিশ তার কিছুক্ষণ পর আসে।

- কিন্তু পুলিশ ওদিকে কি করতে গেছিলো জানেন?

- ওই যে ভাবীর কেস-এর ব্যাপারে আপনার কাছে আসছিলো। আপনাকে না পেয়ে দেখলাম বিল্ডিং এর এদিকওদিক ঘুরাঘুরি করছিলো। হঠাৎ এক কনস্টেবল দেখতে পায় বাচ্চাটাকে।

- আচ্ছা? বাচ্চা কার কি এ ব্যাপারে কিছু জানতে পারছেন কি?

- আসলে ভাই.. পুলিশ লাশ নিয়ে যাওয়ার পর তো আর কিছু আমার জানা নাই। আর এই সব ঘটনা ঘটছে বলে ও তো বলছে বাসা চেঞ্জ করবে।

- কি? কাদের ভাই বাসা বদলাবে?

- হ্যাঁ ভাই।এখানে আর থাকার মতো পরিবেশ নাই।

আমি বেশ চিন্তিত হয়ে গেলাম। ভাবীকে বিদায় দিয়ে বাসায় আসলাম ।পকেট থেকে ফোন টা নিয়ে এস.আই. কে ফোন দিলাম।

- হ্যালো, হ্যাঁ স্বপ্নীল সাহেব বলেন? আসছেন বাসায়?

- জি এখন আসলাম। আপনার সাথে খুব জরুরী কথা আছে। একটু যদি কষ্ট করে আসতেন?

- জি অবশ্যই। আর আপনার কাছে ও আমার প্রয়োজন আছে। আমি আসতেছি।

.

আমি চা বানিয়ে অফিসার কে এক কাপ দিলাম। পাশের দুই কনস্টেবল কে দিবো ভাবলাম কিন্তু ওদের দিকে তাকাতেই জানিয়ে দিলো ওরা চা খাবে না।

অফিসার চা-এর কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন,

- হ্যাঁ স্বপ্নীল সাহেব বলুন। কি বলবেন?

আমি ও চা-এ চুমুক দিয়ে বললাম,

- জানেন? আমার বাসায় চুরি হয়েছে?

অফিসার চায়ের পাপে আর একটা চুমুক দিচ্ছিলো কিন্তু চুরির কথা শুনে চিন্তার ভাজ তুলে বড়বড় করে তাকালেন আমার দিকে।

- চুরি!!

- হ্যাঁ। আপনারা আলমারি খোলা দেখেছেন তার ভেতর দুই সেট গহনার দুইটা খালি খাপ পড়ে আছে আর আপনারা সন্দেহ করার মতো কিছুই পেলেন না?

অফিসার চা এ শেষ চুমুক দিয়ে বললেন,

- দেখুন আপনার আলমারিতে কি আছে তা তো আর আমরা জেনে বসে নেই। আর আলমারির দরজা খোলা ছিলো কি খোলা রেখেছিলেন তা আপনাদের ঘরের ব্যাপার আপনারাই ভালো জানবেন।

- হ্যাঁ আমি জানবো। তবে আমার কাছে শুনতেন।

- আসলে এই রহস্যের বেড়াজালে পড়ে ওদিকে খেয়াল দেওয়া হয়ে ওঠেনি।

আপনি কি এটা শোনানোর জন্য আমাকে ডাকলেন?

আমি চায়ের কাপটা টি টেবিলের উপর রাখা পিরিচে রাখতে রাখতে বললাম,

- এতটুকু হলে ফোনেই বলতাম।আসল কথায় আসি। আমি ভেবে দেখলাম যে,যেহেতু গহনা চুরি হয়েছে শুধু আর কিছুই না।তার মানে চোর আগে থেকেই জানে আমার ঘরে দুই সেট ভারী স্বর্ণের গহনা আছে। সে গহনা নেওয়ার পর আমার ওয়াইফ কে রে'প করে তারপর হত্যা। যদি অপরিচিত কেউ হতো তাহলে রেপ করে হাত-পা বেধে মুখে কিছু দিয়ে চলে যেতো। যাতে চিল্লাতে না পারে।

অফিসার এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আর মাঝেমাঝে মাথা নাড়াচ্ছেন।

আমি আবার বলতে লাগলাম,

- যেহেতু হত্যা করেছে সেহেতু আমার ওয়াইফ তাকে নিশ্চয় চিনে। তাই যাতে প্রমাণ না থাকে সেই জন্য হত্যা করেছে।

অফিসার এবার নড়েচড়ে বসে বললেন,

- বাহ...। আপনি তো ভেতরে ভেতরে ভালোই ইনভেস্টিগেট করছেন দেখছি।

আমি আবার বলা শুরু করলাম,

- তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়ালো এই যে এসব কোন পরিচিত লোক করেছে।আচ্চা অফিসার একটা কথা বলুন তো?আপনারা গেইটের দারোয়ান কে জেরা করেননি?

অফিসার মুখে একটা মুচকি হাসি নিয়ে বললেন,

- শত-শত জটিল কেস সলভ করেছি এই একলা হাতে স্বপ্নীল সাহেব। কি ভাবেন আপনি? এই এস. আই. সাকিবের চোখ থেকে কিচ্ছু এড়ায় না।আপনি বাসার গেইট দিয়ে ঢোকার সময় দারোয়ানকে দেখেছিলেন?


আমি একটু ভেবে বললাম,

- না মানে.. খেয়াল করিনি। ব্যাগ-ট্যাগ ছিলো তো কাছে তাই ওদিকে খেয়াল দেওয়া হয়ে উঠিনি।

- ওই ব্যাটাকে তো গতকাল জেলে ভরেছি।

অফিসারের মুখে কথাটা শুনেই যেন আমি আকাশ থেকে পড়লাম।চোখ দুটো বড়বড় করে অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললাম,

- মানে? কেন? 

অফিসার মুখে বিজয়ীর হাসি ফুটিয়ে তুলে সোফায় হেলান দিয়ে আরামে বসলেন। পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দুই ঠোঁটে চেপে ধরলেন। লাইটার দিয়ে সিগারেট ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোয়া গুলো উপরের দিকে কুন্ডুলী পাকিয়ে ছেড়ে দিয়ে বললেন, 

- সেই ৩বছরের বাচ্চাটাকে খুন করা হয়নি। মেডিকেল রিপোর্ট বলে লিভার ক্যান্সারে মারা গিয়েছিলো বাচ্চাটা। আর লাশটা হসপিটাল থেকে চুরি করে আনা হয়।

অফিসারের কথা শুনে আমি শুকনা ঢোক গিললাম। সব কিছু যেন আবার নতুন করে গুলিয়ে যাচ্ছে। চোখেমুখে প্রশ্নের ছাপ নিয়ে বললাম,

- তাহলে লাশটা এখানে ফেললো কারা? কেনোই বা ফেললো?আর দারোয়ানের কি দোষ ছিলো?

অফিসার নাক দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পৈশাচিক মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, 

- এতো উত্তেজিত কেন স্বপ্নীল সাহেব। আগে শান্ত হন। এস. আই. সাকিব শুধু নামটা মাথায় রাখেন...

দারোয়ানকে জেলে ঢুকানো হয়েছে কথাটা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম।এই দারোয়ানের প্রতিই আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিলো।প্রথমে লুট তারপর মাইশাকে ধর্ষণ করে গলা টিপে খুন। আর আমার বাসার পাশে তিন বছরের বাচ্চার লাশ ফেলে রাখার  কারণ খুঁজতে খুঁজতে ঘুরেফিরে আবার এই দারোয়ানের কাছেই এসে থমকে যাচ্ছে।

অফিসার চোখ ছোট করে আমার দিকে চেয়ে সিগারেটের শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে কিছুটা আরামে বসে বললেন , 

-;স্বপ্নীল সাহেব? ভাবনার শিখরে আছেন মনে হচ্ছে?

আমি মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বললাম,

- না মানে... আসলে বেশ কিছু ছকে আটকে আছি অফিসার। এই ছক কাটিয়ে সামনে এগোতে পারছি না। ঘুরেফিরে সেই একই ছকে মিলিত হচ্ছি।

অফিসার সিগারেটের জ্বলন্ত ফিল্টার টা সামনে টি-টেবিলের উপর চেপে ধরতে ধরতে বললেন,

- আপনার সেই ছকটা দারোয়ানে এসেই আটকাচ্ছে। তাই তো?

আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। অফিসার কিভাবে বুঝলো যে আমি দারোয়ানেই আটকে আছি? আমি তো ওকে নিয়ে  তেমন কিছু বলিনি ।

বেশ অবাক হলে ও আমি মুখে স্বাভাবিকতা ধরে রেখে বললাম,

- ঠিক ধরেছেন অফিসার।

আমার উত্তর শুনে হাসি রেখা ফুটে উঠলো।

কথা বলার ভঙ্গীতে সবজান্তার ভান করে বললেন,

- বুঝি স্বপ্নীল সাহেব। এসব করেই তো পেট চলে। আর সরকার চেয়ারে বসিয়েছে।

আমি আগের প্রশ্নে ফিরে এলাম। কৌতুহল নিয়ে বললাম,

- কিন্তু অফিসার বললেন দারোয়ানকে কেন ধরলেন? আর ওই বাচ্চানকে ফেললো?

অফিসার প্যাকেট থেকে  থেকে আর একটা সিগারেট বেরকরে বললেন,

- চলবে নাকি স্বপ্নীল সাহেব? 

আমি বললাম,

- নাহ.. আমি আসলে স্মোকিং করি না।আগে টুকটাক খাইতাম কিন্তু আমার ওয়াইফের কারণে বাদ দিয়েছি।

অফিসার আমার কথা কানে না নিয়ে তিনি আমার  প্রশ্নের জবাবে বললেন,

- লাশটা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলে যে লিভার ক্যান্সারে বাচ্চাটি মারা যায়। আর বাচ্চাটাকে দেখে পথোশিশু টাইপের মনে হলো।যেহেতু বাচ্চাটা ক্যান্সারে মারা গিয়েছে তাই শহরের সবকয়টি হসপিটাল প্লাস ক্লিনিকে খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম একটা ছোটোখাটো ক্লিনিক থেকে নাকি একটা শিশুর লাশ চুরি হয়েছে। আমরা ক্লিনিক অথোরিটিকে লাশটা দেখালে তারা শনাক্ত করতে পারে। 

আমি অনেকটা মনোযোগ দিয়ে উনার কথা শুনছিলাম। এ পর্যন্ত থেমে অফিসার খাপথেকে বের করা নতুন সিগারেট টা ধরালেন।এক টান দিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া বের করতে করতে আবার বলা শুরু করলেন,

- আমরা ক্লিনিকের সি.সি. টিভির ভিডিও ফুটেজ দেখি। অথোরিটি প্রথমে নানান অযুহাত খাঁড়া করলেও অবশেষে দেখাতে বাধ্য হয়।দেখলাম ভোর ৫টার দিকে হবে হয়তো..

অফিসার সময়টা শিওর হওয়ার জন্য বসেথাকা কনস্টেবলের দিকে তাকালেন।

ওরা সাথে-সাথে বললো,

- জি স্যার ৫ টার দিকে হবে।

অফিসার মাথা নাড়িয়ে আবার বলা শুরু করলেন,

- ওই টাইমে মর্গ থেকে স্ট্রেচারে করে দুজন লোক লাশটা বের করছিলো। একজন গড়নে হালকা-পাতলা। একটু হাইটে শর্ট হবে।আর অপর জন স্বাস্থ্য বেশ ভালো। মাঝারী গড়ন। ঘন চেক-এর শার্ট পরা ছিলো।ক্লিনিকের সকল স্টাফ-নার্স দের ডাকা হলো। কিন্তু চেহারায় কারো সাথে মিল খেলো না। আমরা ক্লিনিকে ঢুকতেই নাকি একটা স্টাফ বাইরে কাজ দেখিয়ে বেরিয়ে গেছে কিন্তু ফেরেনি। অনেকক্ষণ দরে অপেক্ষা করার পর ও তার কোন খবর না পেয়ে শুধু তার নাম ঠিকানা নিয়ে ফিরতে হলো।

অফিসারের মুখে নাম ঠিকানা শুনতেই বললাম,

- নাম কি তার? 

অফিসার সিগারেট মুখে নিয়ে বললেন,

- খাইরুজ্জামান বশির।

আমি মনেমনে এই নামের কাউকে চিনি কি না খুঁজতে লাগলাম।

খুঁজে না পেয়ে হতাশ চোখে চেয়ে বললাম,

- হ্যাঁ তারপর বলুন?

উনি আবার শুরু করলেন,

- তারপর সোজা আপনার বিল্ডিংএ চলে এলাম। দারোয়ানকে ধরলাম । দারোয়ানকে প্রশ্ন করলাম যে ভোর ৫থেকে ৬টার ভেতর কোথায় ছিলি। ও উত্তর দিলো গেটের কাছেই ছিলো। কিন্তু লাশ নিয়ে কারো ভেতরে ঢুকার কথা শুনতেই বানিয়ে বানিয়ে গল্পবলা শুরু করছিলো। ঠাটিয়ে দিলাম এক চড়।

আমি অফিসারকে এখানে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

- কিন্তু ও যে বানিয়ে বলছে তা কিভাবে আপনি বুঝলেন ? 

অফিসার একটা তাচ্ছিল্যের মুচকি হাসি দিয়ে বললেন,

- বানিয়ে গল্প কথার মাইর-প্যাচে ধরা খেয়ে যায় স্বনীল সাহেব। এই পোশাকটা এমনি এমনি সরকার পরিয়ে রাখিনি বুঝিলেন?কিন্ত...

আমি বেশ আগ্রহ নিয়ে,

- কিন্তু কি অফিসার?

উনি উনার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বললেন,

- ওর কথা শুনে মনে হচ্ছে তাকে কেউ কথাগুলো শিখিয়ে দিয়েছে ।

থানায় নিয়ে দু-চার ঘা দিয়েছিলাম কিন্তু মুখ খোলেনি ব্যাটা। আমার নাম এস.আই. সাকিবের কিভাবে মুখ খোলাতে হয় আছে তা আমার জানা আছে।

অফিসার একটু অন্যমনস্ক হয়ে কি যেন ভাবছেন।আমি উনার ভাবনার ব্যাঘাত ঘটিয়ে বললাম, 

- আমার ওয়াইফ খুন হওয়ার কয়েকদিন পরে ওর কাছে জেরা করেছিলাম। কিন্তু তখন ও আমার সাথে বানিয়ে গল্প বলেছে আর ওর অযৌক্তিক কিছু কথায় আমি তা বুঝতে পারি।

আমার কথা শুনে দেখলাম অফিসার আবার কি জানি ভাবতে লাগলেন।এরই মধ্যে উনার ফোনে একটা কল আসে আর তারপর আমাকে বিদায় দিয়ে উনি হনহন করে চলে যান।আমি ঠাঁই সোফায় বসে রইলাম। অনেক গুলা প্রশ্ন এই মুহুর্তে মাথার ভেতর চক্কর খাচ্ছে।

তার মধ্যে প্রধান দুইটা প্রশ্ন হচ্ছে,

দারোয়ানের মুখ বন্ধ রাখতে কেউ এর পিছে কাজ করছে। কিন্তু কে?

আর অপরটি হচ্ছে, একটা মৃত বাচ্চাকে কেনই বা এখানে ফেলবে? তাও আবার ক্লিনিক থেকে চুরি করে? এতে কার কি লাভ? আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা?

এরি মধ্যে আমার ফোনে ও কল এলো। টেবিলের উপর থেকে ফোনটা উঠিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি নাঈমা।

- হ্যাঁ নাঈমা বলো?

- তুমি পৌঁছালে কিন্তু জানালে না কেন? চিন্তা করার আর কেউ নেই নাকি?

হঠাৎ তুমি বলাতে কেমন জানি লাগলো আমার কাছে। কিন্তু ওর এই মিষ্টি অভিযোগের মধ্যে যেন কিছু একটা লুকিয়ে আছে। কি সেটা?

আমি কোমল গলায় বললাম,

- আমি কল দিবো ভেবে রাখছিলাম কিন্তু কি কি নিয়ে যেনো ব্যস্ত হয়ে গিয়ে আর খেয়াল ছিলো না নাঈমা , স্যরি।

- হ্যা.. পর করেই দাও এভাবে। 

একটু রসিকতা করে বললাম,

- আরে না না.. ভুলে গেলে তোমার জন্য জামাই খুঁজে দিবে কে? 

- তোমার আর জামাই খুঁজতে হবে না। আমি কোন বিয়ে করবো না.. হুহ..

নাঈমার এই মুখ ভেঙচির আওয়াজটা যেন শুধার মত লাগলো কানে।

বললা,

- আব্বু কান ধরে কবে না জানি বিয়ের পিড়িতে বসায়।

- বিয়ে করলে এক জনকেই করবো।

- কে সেই ভাগ্যবান?

- তোমারে ক্যান বলবো। আচ্ছা রাখছি পরে কথা বে।

নাঈমার সাথে টুকটাক মজা মাইশা বেঁচে থাকতে ও হতো।কিন্তু এখন আর মন চায় না। কেন জানি নিজের ভেতর অপরাধ কাজ করে।কিন্তু নাঈমার আপনি থেকে তুমিতে যাওয়াটা

মোটেও সুবিধের ঠেকছে না। হঠাৎ এমন করছে কেন ও

.

সোফায় কখন যে ঘুমিয়ে গেছি জানি না। কলিংবেলের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি সকাল ৭টা বাজে।চোখ মুছতে মুছতে দরজা খুলে দেখি কাদের ভাই।দেখলাম উনি সেজেগুজে আছেন।

ঘুম জড়ানো চোখে বললাম,

- কি ব্যাপার কাদের ভাই কোই যাচ্ছেন এতো সকালে? 

- চলে যাচ্ছি স্বপ্নীল ভাই।

উনার কথা শুনে সাথে সাথে ঘুম উধাও হয়ে গেলো। অবাক হয়ে বললাম,

- মানে? কোথায় যাচ্ছেন?

- বাসা ছেড়ে দিয়েছি। অন্য যায়গায় বাসা নিয়েছি। আপনার এই ঘটনার পর আমার নিজের ও খুব ভয় লাগে। জানেনই তো আপনার ভাবী বাসায় একা থাকে।

আমি কিছু একটা বলতে যাবো।কিন্তু কাদের ভাই তাড়াহুড়া দেখিয়ে বললেন,

- আচ্ছা আসি স্বপ্নীল ভাই। পরে দেখা হবে ইনশাল্লাহ।

এই বলে হনহন করে চলে গেলো। আমি একটু বাইরে এসে দেখি ট্রাকে সব গোছানো শেষ।

বেশ অবাক হলাম। রাতারাতি সব গুটিয়ে কেটেপড়ার মতো লাগলো ব্যাপার টা।কিন্তু ট্রাক নিয়েছে কেন? নিশ্চয় দূরে কোথাও বাসা নিয়েছে।আরে...? কাদের ভাই কিসের চাকরী করে সেটাই তো জানা হলো না।পাশে বাসা তাই মুখেমুখে ভালো পরিচয়।

বাসায় এসে বেসিনের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ব্রাশ করছিলাম। না খেয়ে... না ঘুমিয়ে নিজের হাল অবস্থা দেখছিলাম। ওদিকে চাকরীটা ও হয়তো চলে গিয়েছে। এতো দিন অ্যাবসেন্ট হলে কি আর থাকে? এমনিতেই এম.ডি. স্যারের এক দিনের লেটে অফিস গেলে যে কথা শুনতে হয়।

আচ্ছা? অফিসার সাকিব যে বলে গেলেন দারোয়ান নাকি বানিয়ে বলছিলো। আমার সাথে ও এমন করেছে। তাহলে এমন কেউ ওর সাথে রেগুলার কন্টাক্ট রাখে। তাহলে তো দারোয়ানের ফোনার কল লিস্ট চেক করলেই বোঝা যাবে।আমাকে এখনি থানায় যেতে হবে।

মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে কিন্তু বাসায় তো কিছু নাই।খাওয়ার ও এখন সময় নাই। দ্রুত থানায় যেতে হবে।

.

থানায় এস. আই. সাকিবের সামনে বসে আমি। একটু আগে জেলের ভেতর দারোয়ানকে দেখে আসলাম।ওকে দেখে মনে হলো ভালোই মারধর পড়েছে ওর উপর।

কনস্টেবল  দুকাপ চা এনে দিয়ে গেলো।চা-এর কাপটা হাতে নিয়ে অফিসার বললেন,

- আপনি এসেছেন খুব ভালো হয়েছে। এই কেস টা নিয়ে বড্ড ঝামেলায় আছি বুঝলেন? রে'প প্লাস খুন । এতোদিন কেন লাগছে তাই উপর মহল থেকে চাপ আসছে।

আমি উৎসুক হয়ে বললাম,

- আপনার কাজটা সহজ করতে এসেছি অফিসার।

উনি ভ্রু কুচকে আমার দিকে একটু ঝুকে বললেন,

- কিরকম?

- দারোয়ান আপনার এবং আমার সাথে বানিয়ে গল্প বলেছে। দেখুন ও যদি কিছুই না বলতো তাহলে ব্যাপার টা আরো জটিল হতো। কিন্তু ওর হালকা বুদ্ধি সেটা আরো সহজ করে দিছে।

অফিসার এমন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছেন যেন মনে হচ্ছে উনার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। তবুও চোখ বড়বড় করে আমার কথা শুনছেন মনোযোগ দিয়ে। 

আমি বলা শুরু করলাম,

- ওকে নিশ্চয় কেউ এমন ধরনের কিছু বলতে বলেছে যাতে ব্যাপার টা আরো জটিল হয়। কিন্তু দারোয়ান কি এতো জটিলতা বুঝে? গল্প বানাতে গিয়ে নিজের গুলিয়ে ফেলে নিজের ফাঁদে নিজে পা দিয়ে বসে আছে।এখন আসল কথা হচ্ছে এখানে স্পষ্ট যে দারোয়ানের হাত আছে।

আচ্ছা অফিসার.. ? ওকে গ্রেফতার করার সময় ওর সাথে কি ওর ব্যবহার করা ফোন টা কি পেয়েছিলেন ?

অফিসার বললেন,

- হ্যাঁ পেয়েছি। কিছু আননোন নম্বর থেকে বারবার কলা আসার রেকর্ড পেয়েছি।

নম্বর গুলোর রেজিস্ট্রেশন পেপার দেখলাম। সব অজপাড়া গাঁ এর মানুষের আইডি ক্লোন করে সিম তোলা।

আমি উত্তেজনা নিয়ে বললাম,

- এই তো...! তাহলে একটা চক্রের সাথে ওর হাত আছে ওর।

আচ্ছা? নম্বর গুলো কি আপনার কাছে এখন আছে? আমাকে দেওয়া যাবে কি?

প্রথমে নম্বর দিতে নাকোচ করলে ও পরে কি ভেবে দিয়ে দিলেন। নম্বর গুলো আমি টুকে নিলাম।

অফিসার বললেন,

- একটা অদ্ভুত ব্যাপার স্বপ্নীল সাহেব।

আমি এক নজরে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,

- কি ব্যাপার?

- দারোয়ানের ফোন কেঁড়ে নাওয়ার পরে এই দুই দিনে একটা কল পর্যন্ত আসেনি। অথচ ওকে ধরার ২০ মিনিট আগেই একটা ইনকামিং কল আসছিলো।

আমি উনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

- আচ্ছা? ওই ২০ মিনিট আগে আপনি কোথায় ছিলেন? 

অফিসার একটু ভেবে বললেন,

- আপনার বাসার আশেপাশে খুঁজে দেখছিলাম যদি কোন প্রমাণ মিলে যায় তাই ।

আমি বেশ জোরে বললা,

-  ইয়েসস...

তাহলে অপরাধী চক্র আপনাদের উপর নজর রাখছে। হয়তো আপনারা কি করছেন সেটা দারোয়ানের কাছে আপডেট নিচ্ছিলো। 

অফিসার টেবিলের উপর পিরিচে রাখা একটা বিস্কিট হাতে নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে একটা দীর্ঘস্বাস ফেলে বললেন, 

- ওকে পিটিয়ে তো কোন লাভ হলে না মুখ খুলাতে পারলাম না।

- ওকে হয়ত মার্ডারের হুমকি দিয়ে রাখছে। মুখ খুললেই খুন করে দিবে।আপনারা তো টুকটাক মাইর দিবেন মাত্র এর বেশি তো কিছু না। ও হয়ত জীবনের ভয়ে মার সহ্য করছে।

অফিসার মাথা নাড়িয়ে বললেন,

- আসলেই। অনেক সুন্দর একটা কথা বলেছেন স্বপ্নীল সাহেব।

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে বললাম,

- আসি অফিসার। আপডেট কিছু জানলে আমাকে জানিয়েন প্লিজ।

.

বাসায় এসে জামা খুলে প্যান্ট চেঞ্জ করতে গিয়ে প্যান্টের পকেট থেকে অফিসারের কাছ থেকে নেওয়া নম্বরের কাগজটা বের করলাম। নম্বর গুলো হারিয়ে যেতে পারে বিধায় ডায়েরীতে লিখে রাখলাম।

নম্বর লিখতে লিখতে মনে পড়লো আরে নাঈমাকে কল দিয়ে যে থ্রেড দিছে তার নম্বর তো অফিসারকে দেওয়া হলো না। রহস্যের জালে ঘুরপাক খেতে খেতে অন্যকিছু খেয়ালে থাকছে না।

মানিব্যাগ থেকে সেই নম্বরের কাগজ বের করে ডায়েরীর একই পৃষ্ঠায় লিখে নিলাম।এবার ডায়েরীতে মাত্র লেখা নম্বর গুলো চোখ বুলাতে গিয়ে একটা বিষয় খেয়াল করলাম। তিনটা নম্বর দুইবার করে লেখা হয়েছে।

কি অদ্ভুত? দুইবার লিখলাম কিভাবে এক নম্বর। এবার অফিসারের কাছ থেকে নেওয়া নম্বরের কাগজ আর নাঈমার কাছ থেকে নেওয়া নম্বরের কাগজ এক করে দেখি নাঈমার কাগজের নম্বরের সাথে অফিসারের কাগজের নম্বরে ৩ টা নম্বরের মিল।

আমি যেন ধাক্কা খেলাম। চোখ বড়বড় করে বারবার মিল করলাম। আসলেই তাই।

তারমানে দারোয়ানকে যে ফোন দেয় সেই নাঈমাকে মারার থ্রেড দিয়েছে?ও মাই গড...

(চলবে)

(আগামী পর্বে সমাপ্ত, সবাই গঠনমূলক মন্তব্য করুন, ধন্যবাদ)


9 মন্তব্যসমূহ

  1. Your story is a breath of fresh air – clear, concise, and packed with valuable information.

    উত্তরমুছুন
  2. The website's commitment to accessibility is commendable. Inclusive design for all users.

    উত্তরমুছুন
  3. "This story writer website is a literary haven – where creativity, imagination, and captivating narratives come to life!"

    উত্তরমুছুন
  4. "The website's commitment to load time optimization for slower internet connections is considerate – reaching a wider audience."

    উত্তরমুছুন
  5. এটি সত্যিই উপভোগ্য এবং শিক্ষণীয়

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন