অচেনা এক বাইক ওয়ালার কাহিনী 🏍️



 প্রায় প্রতিদিন রাতেরবেলা আমি একরকম শখ করেই বাইক নিয়ে বের হই। রাত দুইটা/আড়াইটা পর্যন্ত ভাড়ায় চালাই। তারপর বাসায় ফিরে যাই। এতে আমার রাতের শহর দেখা হয় আবার কয়টা টাকাও পকেটে আসে। তাতে রাতের চা-নাশতার খরচ হয়ে যায়। বনানী আটাশ নম্বরে বসে আছি।অনেকক্ষণ ধরে কেউ নাই রাস্তায়। বন্ধের দিন দেখে হয়তো। তবে কিছুক্ষণ পর পর তীব্র গতিতে গাড়ি যাচ্ছে। 


এর মাঝেই এক মেয়ে এসে বললো,

-- 'যাবেন ভাইয়া?'


-- 'কই যাবেন?'


-- 'মগবাজার মোড়ে।'👀


-- 'যাবো। কিন্তু দেড়শো টাকা লাগবে।'


-- 'কি বলেন ভাইয়া? রাস্তা ফাঁকা। রাত প্রায় এগারোটা বাজে। এপ্সে ভাড়া আসে সত্তর টাকা। একশো টাকা যাবেন?'


-- 'আপা, আর বিশ টাকা দিয়েন। এইখানে এখন কোন বাইক পাবেন না।'


-- 'অদ্ভুত! আপনারা এভাবে মানুষের সুযোগ নেন! আচ্ছা, হেলমেট দেন।'


-- 'আপা, হেলমেট নাই।'


-- 'তাহলে যাবো না।'


-- 'আচ্ছা, আমার হেলমেট পরেন।'


মেয়েটার বয়স চব্বিশ/পঁচিশ হবে। দেখতে ভীষণ সুন্দর কিন্তু ক্লান্ত দেখাচ্ছে। হেলমেট দিতেই বাইকে উঠে বসলো। আর বললো,


-- 'রাস্তা খালি দেখে স্পীড বাড়াবেন না। আমি বাইকে ভয় পাই। আর আপনি হেলমেট রাখেন না কেনো?'


-- 'হেলমেট ছিলো। হারায়া গেসে।'


-- 'বাইক রেখে আপনি কোথায় হারিয়ে গিয়েছেন যে হেলমেট চুরি হয়ে গিয়েছে !'


-- 'হা হা হা, গল্প শুনবেন?' (বাইক স্টার্ট নিতে নিতে)


-- 'বেশি লম্বা গল্প বলবেন না, প্লিজ... এমনিতেই অনেক লেকচার শুনেছি আজকে।'


-- 'আচ্ছা! একটু আগে নিকেতন থেকে একজন কালো কোট পরা ভদ্রলোক আমার বাইকে উঠে। বনানী আটাশ নম্বরে আসবে। বিশ্বাস করেন, তারে নামানোর পাঁচ মিনিট আগেও আমি তার সাথে গল্প করলাম। আসার পথে লেকের সামনে টং দোকানে চা খেলাম। সুঠাম দেহের সুদর্শন যুবক। কথা বললেই গালের টোল স্পষ্ট দেখা যায়। অল্পতেই হো হো করে হাসে। কিন্তু আটাশ নম্বরে এসে, তারে আর বাইকের পিছনে পেলাম না। অথচ আমি বাইক চালালাম ৫০এ। পড়েও যায় নাই। বাইক পাতলাও লাগে নাই। বরং আপনি বসাতে বাইক আরও ভারী লাগতেসে। মনে হইতেসে আমরা বাইকে তিনজন।'


-- 'এখানেই রাখেন। মোড়ের ওপাশে যাওয়া লাগবে না।'


বাইক থামাতেই, মেয়েটা হেলমেট খুলে দিলো। আর টাকা দিয়ে তড়িঘড়ি করে হেঁটে গেলো। হয়তো আমার কাহিনি শুনে ভয় পেয়েছে। ভয় পাবার মতোই কাহিনি। আমারও গা শিউরে উঠছে ভয়ে। 


কি করবো ভাবতে ভাবতে দোকান থেকে সিগারেট নিয়েছি। ধরাতে ধরাতে বাইকে এসে বসলাম। এক লোক, টলতে টলতে এসে বললো,


-- 'ফকিরাপুল যাবেন?'


-- 'যাবো। একশো টাকা লাগবে।'


লোকটা কথা না বাড়িয়ে বাইকে উঠে যেতে লাগলো। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে আমি বললাম,


-- 'দাঁড়ান ভাই, আগে আমি উঠে নেই।'


সিগারেট ফেলে, আমি বাইকে বসে ভদ্রলোককে হেলমেট দিলাম। নেশার ঘোরে ভদ্রলোক হেলমেট উল্টো করে পরেছে। আমি খুলে ঠিক করে দিলাম। উনি বাইকে বসলেন। বাইক স্টার্ট দিলাম। আর ভদ্রলোক হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন। বাইক থামালাম। উনাকে বাইক থেকে নামতে বললাম, উনি নেমেও গেলেন। কিন্তু কেঁদেই যাচ্ছে। ঝামেলায় আটকে গেলাম। মাঝে মাঝে এমন টাল হওয়া মানুষ পাই। কিন্তু এমন সিচুয়েশনে ফেলেনি কেউ।


-- 'কি সমস্যা ভাই? কি হইসে, আমাকে বলেন।'


-- 'আমার সব শেষ ভাই। সব শেষ।'


-- 'কি হইসে আমাকে বলেন।'


-- 'আমার একটা মাএ আমার সেই ছেলেটা সাতদিন আগে সু'ইসাইড করছে ।'


-- 'ইন্না-লিল্লাহ। কি বলেন!'


-- 'হু, ওর বয়স ছিলো ষোলো। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনের জন্য প্রায়সময়ই বুলিংয়ের শিকার হতো। ছেলেটা ডিপ্রেশনে ছিলো। আমি বাবা হয়ে কিছু করতে পারলাম না। জীবন শুরু হওয়ার আগেই ছেলেটা সব শেষ করে দিলো। কিছুতেই নিজেরে মাফ করতে পারতেসি না। বাসায় ওর মায়ের দিকে তাকায়া কথা বলতে পারি না। আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যর্থ মানুষ।'


এসব বলেই ভদ্রলোক হাউমাউ করে কান্নাকাটি করেই যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে মনে হয় কাউকে জড়িয়ে ধরা সবচেয়ে সেরা হিলিং। আমি বাইক থেকে নেমে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। কিছুক্ষণ কেঁদে উনি চুপ হয়ে গেলেন। তারপর আচমকা বমি করলেন। আমি দোকান থেকে পানি এনে দিলাম। উনি কুলি করে বললেন,


-- 'আমাকে একটু বাসায় দিয়ে আসবেন?'


-- 'অবশ্যই ভাই। বাইকে উঠেন।'


এবার উনার বলা লোকেশন অনুযায়ী উনাকে বাসার নিচে নামিয়ে দিলাম।আমি ভাড়ার টাকা নিতে চাইলাম না, কিন্তু উনি জোর করেই শার্টের পকেটে টাকা গুঁজে দিলেন।


এবার বাইক ঘুরিয়ে ফকিরাপুল মোড়ের ওপাশে দাঁড়িয়ে আছি। এক ছেলে এসে বললো,


-- 'ভাইয়া, আমাকে একটু ঢাকা মেডিকেলের সামনে নামিয়ে দিবেন।'


উষ্কখুষ্ক চুল, আর ক্লান্ত চেহারা দেখে মনে হলো বাসায় কেউ গুরুতর অসুস্থ। কিছু জিজ্ঞেস না করে বাইকে উঠতে বললাম।


ছেলেটাকে ঢাকা মেডিকেলের সামনে নামিয়ে দিলাম। খুব বিনীতভাবে বললো,


-- 'ভাই, আপনার ফোন নম্বরটা দেন। আমি পরে আপনাকে একশো টাকা পাঠিয়ে দিবো। আমার কাছে এক্সট্রা টাকা নাই। যা আছে তা দিয়ে বাবার জন্য ইঞ্জেকশন, আর ওষুধ কিনতে হবে। প্লিজ, আমাকে মাফ করবেন।'


-- 'না, ঠিক আছে ভাই। মানুষই তো মানুষের কাজে আসে। টাকা লাগবে না। আপনি যান।'


-- 'অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই। আমি আপনাকে ভুলবো না।'


ছেলেটা চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ে হাসপাতালের ভিতরে চলে গেলো। যতক্ষণ পেছন থেকে দেখা যাচ্ছিলো আমি বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তারপর চলে গেলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভিসি চত্ত্বরে। একটু শ্বাসকষ্ট আর ক্লান্ত লাগছিলো। 


বাইক লক করে, ভিসি চত্ত্বরে গিয়ে বসলাম। একটু চোখ বন্ধ করলাম। চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে আছি। লাস্ট দুইটা ঘটনা খুব পোড়াচ্ছে আমাকে। ছেলেটার জন্য খারাপ লাগছিলো। আবার ছেলে হারানো বাবার জন্যও খারাপ লাগছিলো। হঠাৎ, কেউ একজন আমার নাম ধরে বলে উঠলেন,


-- 'রিয়াদ সাহেব!'


চোখ খুলে দেখি ইনি সেই ভদ্রলোক। যিনি নিকেতন থেকে বনানী যাবার জন্য বাইকে উঠেন। আর আমার হেলমেট নিয়ে উধাও হয়ে যান।


ঘাবড়ে গিয়ে বাইক নিয়ে চলে যেতে চাই। বাইকে বসতেই, তিনি বাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন,


-- 'আপনার অনন্তকালের যাত্রাপথে আপনাকে স্বাগতম। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি। এখন আর হাতে একদম সময় নেই। দ্রুত যেতে হবে। না হয় আবার গাড়ি মিস করবো আমরা।'


কথাগুলো শুনতে শুনতে চোখের চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসলো। আর বেশ কিছু মানুষ দেখতে পাচ্ছিলাম যারা সবাই সাদা পোশাক পরিহিত। আর হাত বাড়িয়ে আমাকে ডাকছে।


(সমাপ্ত)...

--------

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন