বড় ছেলের ইন্টারের রেজাল্ট দিবে। উনি নিশ্চিত ছেলে এবার অনেক ভালো রেজাল্ট করবে। তিনি তার ছেলেকে কথা দিয়েছেন রেজাল্ট ভালো করলে বাইক কিনে দিবেন। আরও কতশত আশা দিয়েছেন।
আজকে অফিস থেকে দ্রুত চলে এলেন। বাসায় ঢুকেই ছেলেকে ডাকতে লাগলো। দেখলো টেবিলের উপরে ল্যাপটপ অন করা। কাছে গিয়ে দেখেন কারো রেজাল্ট বের করা। ভালো করে খেয়াল করে দেখেন এটা উনার ছেলের রেজাল্ট। তার ছেলে ফেল করেছেন। রাগে, কষ্টে তেড়ে যান ছেলের রুমের দিকে।
রুমে গিয়ে দেখেন ছেলের ঝু'লন্ত শরীর ঝুলে আছে সি'লিং ফ্যান এর সাথে। তার পায়ের আঙুলে ঝুলে আছে একটি চিরকুট। রহিম সাহেব স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার পা যেন এগোতে চাইছে না। আস্তে এগিয়ে গেলেন। তার এখন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথা তিনি তা ভেবে পাচ্ছেন না।
ছেলের পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। পাগলের মতো চিৎকার করে উঠলেন। একলা বাড়িতে মা মরা ছেলেটা কে নিয়ে থাকেন। আশে পাশে ও কেউ থাকেনা। তাই চেচামেচিতেও কেউ আসেনি। ছেলের লাশটাকে নামিয়ে বিলাপ করে কাঁদতে লাগলেন। হঠাৎ মনে পড়লো ছেলের আঙুলে থাকা চিরকুটের কথা।
চিরকুটটা নিয়ে পড়তে লাগলেন -
❝❝❝
'প্রিয় বাবা' …
'জানি তুমি এখন অঝোরে কান্না করছো। এমন অযোগ্য ছেলের জন্য কান্না করো না বাবা। আমি কখনো তোমার মনের মতো হতে পারিনি। সবসময় চেষ্টা করেছি তোমার কথা রাখতে। কিন্তু আমি পারিনি বাবা। বাবা বিশ্বাস করো আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি ভালো করার। কিন্তু আমার ভাগ্য হয়তো ছিলো না ভালো কিছু। আমি ব্যার্থ, বাবা। আমি যা চেয়েছি তাই পেয়েছি শুধু পাইনি মানসিক সাপোর্ট।
তোমার মনে আছে বাবা? আমি যদি ভালো রেজাল্ট না করি তাহলে তুমি মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারবেনা। তুমি বলেছিলে যে আমি যদি ভালো রেজাল্ট করি তাহলে আমাকে বাইক কিনে দিবে ঘুরতে নিয়ে যাবে। কিন্তু কখনো বলো নি যে খারাপ রেজাল্ট করলেও তুমি আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে। তুমি আমার ভালো সময় টাতেই পাশে থাকতে চেয়ে ছিলে কখনো বলোনি যে চিন্তা করিস না খাতার কয়েকটি নাম্বার তোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। তখন যদি একটু বুঝার চেষ্টা করতে তাহলে হয়তো আজ আমার এই সীদ্ধান্তটা নিতে হতো না …
ক্ষমা করে দিও বাবা। তোমার সম্মান টা রাখতে পারিনি। ভালো থেকো তুমি।'
ইতি
'তোমার অযোগ্য সন্তান!'
❝❝❝
----
চিরকুট টা পড়া শেষ করে দেখেন চোখের পানিতে কাগজটা ভিজে গিয়েছে। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন আর অঝোরে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন।
ঘুম ভেঙে গেলো রফিক সাহেব এর। চিৎকার করে উঠলেন ছেলের নাম ধরে, চোখ বন্ধ রেখেই চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'আয় বাবা তুই ফিরে আয়।' রফিক সাহেব এর চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে দৌড়ে আসে তার ছেলে রবিন। এসে বাবা বলে ডাকতে থাকে, আর বলে, 'বাবা তোমার কি হয়েছে?'
ছেলের ডাকে হুঁশে এলেন তিনি। ছেলেকে সুস্থ ভাবে সামনে দেখে জড়িয়ে ধরেন তিনি। বাচ্চাদের মতো করে কেঁদে উঠেন। উনার এমন আচরণে রবিন কিছুটা অবাক হয়। পরে উনাকে শান্তনা দেয়। কিছুটা স্বাভাবিক হলে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছিল। বলেন কিছু হয়নি …এমনি খারাপ সপ্ন দেখেছেন।
উঠে ফ্রেশ হয়ে ছেলেকে নিয়ে নাস্তা করতে বসেন। জিজ্ঞেস করেন যে রেজাল্ট কবে দিবে। ছেলে বলে ২ দিন পরে দিবে। চুপচাপ নাস্তা করে রেডি হয়ে নেন। ছেলেকেও তৈরি হতে বলেন। ছেলেকে বাইকের শো রুমে আসেন। বলেন যে তোমার যে বাইক টা পছন্দ হয় তুমি সেটাই নাও। ছেলে অবাক চোখে তাকায় তার দিকে। মনে মনে চিন্তা করে আজ কি হয়েছে বাবার, সকাল থেকে কেমন অদ্ভুত আচরণ করছেন। ছেলের এমন চাহনি দেখে বলেন, সমস্যা নেই রেজাল্ট এর আগেও তুমি আমার ছেলে আছো, রেজাল্ট এর পর ও তুমি আমারই ছেলে। আর আমি আমার ছেলেকে বাইক কিনে দিচ্ছি। খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে ছেলে।
.
রেজাল্ট এর দিন উনি অফিসে যান নি। সকালে ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে চলে যান সারাদিন ঘুরাঘুরি করেন। রাতে বাসায় এসে বসেন দু'জন। এমন সময় ছেলের বন্ধু আসে মিষ্টি নিয়ে। সে A+ পেয়েছে তাই মিষ্টি দিতে আসে। আর সাথে বলে রফিক সাহেব এর ছেলে নাকি A- পেয়েছে। ছেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে তার শরীর কাঁপছে। রফিক সাহেব ছেলের কাঁধে হাত রেখে বলেন!
-- 'বাবা ফেল তো করিস নি।'
বলেই এক গাল হেসেদেন। বলেন, 'চল বাপ ব্যাটা এ খুশিতে পার্টি করবো।'
বাবার এমন কথায় আবারও অবাক হয় সে। ছেলে প্রশ্ন করে,
-- 'বাবা আমি তোমাকে বলেছি আমার রেজাল্ট ভালো হয়নি তুমি রাগ করো নি?'
রফিক সাহেব তিনি হেসে জবাব দেন,
-- ' আমার ছেলের রেজাল্ট সেটা কি আমার ছেলে থেকে দামি নাকি ?'
-----
-----------
---------------
১২ বছর পর …
রফিক সাহেব বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। খবরের কাগজে একটা নিউজ দেখে চোখ আটকে যায় উনার। চশমাটা পরে ভালো করে দেখেন, যে দেশের সেরা ব্যাবসায়ীর তালিকায় তার ছেলের নাম সবার প্রথমে। গর্ভে বুকটা ভরে যায় তার। সেদিনের সেই ছোট্ট অনুপ্রেরণা টা আজ তার ছেলেকে এখান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে …
এমন সময় তার ছেলে ফোন করে।
– ছেলে : 'বাবা! তৈরী হয়ে নাও নতুন কোম্পানিটার উদ্বোধন করতে হবে তোমাকে। আর ওটার মালিকও তুমি। তৈরী হয়ে নাও আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাবো' …
রফিক সাহেব মুচকি হাসলেন …!
(সমাপ্ত)...
#একটি_কথা
#ছোটগল্প
#সংগৃহীত
--------
গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন। আর কমেন্টে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না।

