গল্প : সুখের সন্ধান প্রথম পর্ব (০১)




-- " তুমি আবার একটা বিয়ে করো নেও অয়ন, এটা তোমার কাছে আমার একটা আবদার। "

-- " পাগলের মতো কথা বলো না নয়না। তোমার এমন ছেলেমানুষী আবদার আমি মরে গেলেও পূর্ণ  হতে দেবো না আমি। "

-- " কেন পারবে না তুমি? আমি নিজে মা হওয়ার চেয়ে যে তোমায় বাবা হতে দেখতে চাই বেঁচে থাকতে। তোমার সে স্বপ্ন আমি নিজে পূরণ করতে পারছি না, তাই তা পূর্ণ করার দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণ আমার। তোমায় নিজ হাতে আবার বিয়ে দিয়ে সন্তানের অভাব পূরণ করতে চাই আমি। "

-- " আচ্ছা নয়না সত্যি করে বলো তো আমাদের মাঝে কি ভালোবাসার কমতি ছিলো ? "

-- " না তা নেই। "

-- " তাহলে আল্লাহ আমাদের মাঝে সন্তান দিলেন না সেখানে অন্য কেউ আসলে যে তার আর আমার সন্তান হবে সেটার কি নিশ্চয়তা দিবে তুমি নয়না?   " 

.

চোখ পানিতে টলমল করছে এই গাল বেয়ে পড়লো বলে, তাতেই অয়ন বুকের ভিতর জড়ায় নিলো নয়না কে দুই হাত দিয়ে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই যাচ্ছে নয়না, অয়ন বাঁধা দিচ্ছে না শুধু ডান হাত দিয়ে বউ এর মাথার চুলে বিনি করে দিচ্ছে। 

কাঁদুক প্রাণ খুলে বুকের ভিতরের জমানো কষ্ট গুলো কান্নার পানির সাথে ঝড়ে পড়ুক নয়নার। কিন্তু অয়ন তো পুরুষ মানুষ তারও তো অনেক চাপা কষ্ট ভিতরে সে কিভাবে কাঁদবে পুরুষ মানুষ হয়ে তবুও কয়েক ফোঁটা চোখের পানি পড়ে তার চোখ থেকে নিজের অজান্তেই। 

.

'মামা চকলেট' 'মামী চকলেট' বলে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকে অয়নের ছোট বোন আমরিন এর ছেলে ঈনান। চোখের পানি মুছে দুজনেই স্বাভাবিক হয়ে উঠে দাঁড়ায়। 

নয়না ঈনানকে কোলে তুলে আদর করে আর অয়ন চকলেটের বাক্স বের করে ভাগিনার হাতে দেয়। চকলেট পেয়ে খুশিতে ঈনান মামীর কোল থেকে মামার কোলে যেতে হাত বাড়ায়। ঈনান কিছুক্ষণ মামার কোলে থাকার মামার কোল থেকে নেমে বাইরে চলে যায় হাত ভর্তি চকলেট নিয়ে। 

.

ঈনান চলে যাওয়ার পর অয়ন ঘরের দরজা টা বন্ধ করে নয়না কে কাছে টেনে নেয়। চোখ পানিশূন্য হলেও হাত দিয়ে মুছে দেয় নয়নার চোখ ও গাল, আর জিজ্ঞেস করে, 

-- " আজ কেনো এতো শক্ত মেয়েটা ভেঙে পড়লো হঠাৎ করে কি এমন হলো ?  

কেনোইবা কষ্টে কেঁদে উঠলো তোমার চোখ, মুখ? 

আমায় জানতে হবে নয়না তোমার যন্ত্রণার কারণ, এ বাড়ির কেউ কি তোমায় কিছু বলছে নাকি বলো আমার কাছে আবারও। "

-- " না কেউ আমাকে কোন কিছু বলে নি , তোমার পরিবার তো আমার পরিবারের মতোই  । তাদের সব কথা আর  সবসময়ই  হাসিমুখে মাথা পেতে নিয়ে চলছি এতোদিন পরবর্তী সময়েও তাই হবে। "

-- " আমি বুঝতে পারছি, মা আবারও তোমায় সন্তানের জন্য খোঁটা দিয়েছে। 

বলো কি বলেছে? "

-- " বাদ দাও তো এসব বিকেল পার হয়ে গেছে সবার জন্য নাস্তা বানাতে হবে আমি গেলাম, থাকো তুমি। "

নয়নার পিছে পিছে অয়নও রান্নাঘরে আসে, তাকে রান্নার কাজে সাহায্য করার জন্য। গ্যাস এর চুলায় পানি বসায় অয়ন চা করার জন্য। নয়না নুডলস রান্না করে আর বিস্কুট সাথে কিছু ফলও কেটে দেয়। সব খাবার টেবিলে সাজিয়ে অয়ন নিজেই বাবা- মা সহ বাড়ির সকলকেই ডাকে টেবিলে বিকেলের নাস্তা করার জন্য। 

নাস্তা খেতে খেতে মা বলে উঠে, 

-- " সাত বছর তো হতে চললো আর কবে নাতি-নাতনীর মুখ দেখবো আমি আর তোর আব্বা।তোর বউকে কথাটা জিজ্ঞেস করে আমাদের জানাস, তাকে তো আবার কোনো কিছু বলা যায় না। বললেই যেন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। "

শ্বাশুড়ি মায়ের কথা শুনে নয়নার মুখটা অন্ধকার হয়ে যায়। 

-- " মা তুমি এভাবে তাকে দোষ দিচ্ছ , সন্তান না হওয়ার জন্য কি শুধুই নারীরা দায়ী নাকি । যদি তোমার মনে এমন ভাবনা থাকে  সেটা ভুল ধারণা তেমার। আমাদের  সন্তান না হলে সেই সমস্যা টা আমাদের উভয়ের মধ্য , তার জন্য তুমি শুধু একজন কে কোন ভাবে দোষারোপ করতে পারো না। "

কথা গুলো জোর গলায় সবার সামনে বলে অয়ন, নয়না বাঁধা দিয়েছিলো পাশে থেকে ওভাবে গুরুজনের সামনে কথা না বলার জন্য কিন্তু অয়ন শুনে নাই নয়নার কথা।কথা শেষ করে অয়ন নিজের ঘরে চলে যায়, অয়ন চলে যাওয়ার পর মা-ও রাগ হয়ে উঠে যায় ছেলেকে গাল-মন্দ  করতে করতে। তারপর অন্য সবাই চলে যায়, যার যার ঘরে। 

.

শ্বশুর বাবা নয়নার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলে,

-- " বউমা তোমার শ্বাশুড়ি একটু রাগী মানুষ তুমি তো যানোই ওর কথায় কষ্ট পেয়ো না তুমি। "

-- " না বাবা কি যে বলেন আপনি, আমি কিছু মনে করি না এসব কথায়, আর মা এসব কথা বলবে সেটাই স্বাভাবিক। "

নয়না বাড়িতে কাজে সাহায্য করার জন্য ছোট একটি মেয়েটাকে সবকাজ আস্তে  আস্তে শেষ করতে বলে ঘরে চলে যায় দ্রুত অয়ন কি করছে সেটা দেখার জন্য। 

ঘরে এসে দেখে অয়ন ঈনানের সাথে ঘোড়া ঘোড়া খেলছে। 

-- " তুমি সবার সামনে এই ধরনের কথা গুলো না বললেও পারতে। "

-- " মাঝে মধ্যে মানুষের এসব বাজে কথার কথার উচিত জবাব দিতে হয় নয়না, তা না হলে পদে পদে সবার থেকে কথা শুনতে হবে। "

-- " মামা কুটু কথা কি? " 

ঈনানের মুখ থেকে এই কথা শুনে হেসে উঠে দু জনেই। 

বোনের ছেলে ঈনানকে নিয়ে অবসর সময় কাটায় তারা।ঈনানের মায়ের মানসিক সমস্যা আছে কখনো স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করে আবার কখনো কিছুই বুঝে না পাগলের মতো আচরণ ও চিৎকার করে, কাঁদে আবার কখনো হাসে সারা দিনরাত ধরে। এই সমস্যার জন্য মেয়ে বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই রাখছেন অয়নের বাবা-মা। 

.

নয়নাকে মন থেকে শ্বাশুড়ি মা হয়তো আজও মেনে নিতে পারেন নাই,তারজন্য বউমার প্রায় প্রতিটি কাজে খুঁটে খুঁটে ভুল বের করার চেষ্টা করেন তিনি। বিয়ের প্রথমে রোজরোজ শ্বাশুড়ি মায়ের গাল-মন্দ শুনতে হতো নয়নাকে, সে সব মুখ বুঝে সহ্য করতো। অয়ন যখন বাসায় থাকতো না তখনই তিনি অত্যাচার করতেন নয়নার সাথে।

নয়না স্বামী অয়নকে সবসময় তার পাশে পেয়েছে, অনেক সাপোর্ট পায় সে স্বামী'র কাছ থেকে। শুধুমাত্র অয়নের জন্যই সে তার পড়াশোনা টা শেষ করতে পেরেছে ভালোভাবে শ্বাশুড়ি মায়ের ঘোর আপত্তি থাকা স্বত্বেও।

বিয়ে হওয়ার পরেই নাতিনাতনির মুখ দেখতে চেয়েছেন মা, কিন্তু নয়নার পড়াশোনা শেষ না করে সন্তান নেভে না বলে দিয়েছে । 

এখন নয়না সবসময়ই ভাবে তখন হয়তো একটা বাচ্চা নিলেই হতো তার কোল এভাবে শূন্য থাকতো না আর সবার এতে কথাও শুনতে হতো না।

মা হওয়ার বয়স তো এখনো পেরিয়ে যায় না তাই না, ডাক্তার বলেছেন আমি খুব ভালোভাবে দেখে  স্বামী-স্ত্রী কারোর কোনো রিপোর্ট খারাপ নেই সব স্বাভাবিক তবুও কেনো পৃথিবীতে তাদের সন্তান আসতে চাইছে না এটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। সন্তানের জন্য তাদের এখন সবসময় সৃষ্টিকর্তা কে স্মরণ করা উচিত।নয়না তাই করে,পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সেই সাথে কোরআন শরিফ পাঠ করে ফজরের নামাজ ও মাগরিবের নামাজ এর পর। 

.

রাতে খাওয়ার পর নয়না শুয়ে ভাবছে বিয়ের পর শুরুতেই একটা সন্তান নিলেই হয়তো ভালো হতো, সে মা আর অয়ন বাবা ডাকটা শুনতে পেতো। অয়নের যে অনেক বড় স্বপ্ন বাবা হওয়া, এসব কথা ভেবে বালিশ ভেজায় অশ্রুপাতে সে। 

সকাল হলে নয়না উঠে সকলের জন্য খিচুড়ি রান্না করে, খিচুড়ি খেয়ে বাবা আর অয়ন তাদের কর্মক্ষেত্রে যায়। অনেক বড় ব্যবসায়ী অয়নের বাবা, অয়নও বাবার সাথে ব্যবসায় জড়িত আছে। ছোট বোনের স্বামী বাড়িতে অলস   সময় কাটায় বেশির ভাগ সময় মাঝে মধ্যে অয়নের সাথে যায় টুকটাক  কাজের দেখাশোনা করতে তার বাহিরে সে তেমন কোন কাজ করে না। 

দুপুরে অয়ন বাড়িতে খেতে এসে আর দোকানে যায় না, শরীরটা ভালো নয় আজ তার। শুয়ে আছে বিছানায়, এমন সময় নয়না ঘরে ঢুকে বলে সে কিছুদিনের জন্য বাপের বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে চায়। এ কথা শুনে অয়ন চমকে উঠে নয়নার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই এ পৃথিবীতে আর যে একটা ভাই আছে তার বউ এর ব্যবহার ভালো নয় জন্য আজ কয়েকবছর হয় নয়না সে বাড়িতে যাওয়ার কথা বলে নাই। 

-- " নয়না আজ হঠাৎ ও বাড়িতে যেতে চাইছো তুমি, কি হয়েছে তোমার আমায় সত্যিটা বলো। "

-- " কিছু হয়নি আমার এমনি ভাই আর ভাতিজি দুটোকে দেখতে ইচ্ছে করছে আমার খুব। "

-- " এই তো দুইমাস আগে ওরা এসে থেকে গেলো বাড়িতে। "

-- " তবুও আমি যেতে চাই। "

-- " না, আমি তোমাকে যেতে দিবো না নয়না "

এই কথা বলে নয়নাকে জড়িয়ে ধরে অয়ন।

সাথে সাথে নয়না কেঁদে বলতে থাকে, ঈনানের আব্বু ইলিয়াস ভাই তার দিকে ইদানীং খারাপ দৃষ্টি দিয়ে তাকায় এটা-সেটা বলে। এই কথা শোনার পর অয়ন তার বুক থেকে নয়নার মুখটা তুলে রাগান্বিত চোখে জিজ্ঞেস করে, 

-- "  ইলিয়াস কি তোমায় কিছু বলেছে নাকি আমার কাছে কিছু লুকাবা না এখুনি আমার কাছে বলো কি বলেছে তাড়া তাড়ি। "

-- " আজ সকালের পর ঈনানকে নিতে ওদের ঘরে গেলে উনি আমার হাত ধরার চেষ্টা করছে আবার কিছু দিন আগে বলে ভাবি আপনাদের বৈবাহিক জীবনে কি কোনো গোপন সমস্যা আছে যার জন্য আমি ফুপা হতে পারছি না। 

আবার বলছে বাচ্চা না হওয়াই ভালো চেহারা ফিট থাকে যেমন আপনার চেহারা এখনো দারুণ আর্কষনীয় আর আপনার ননদ কে দেখুন কেমন মুটিয়ে গেছে এসব বলছে উনি আমায়। "

-- " এতো দিন আমায় বলো নাই কি জন্য এসব কথা। ইলিয়াস এর এতো বড় স্পর্ধা তোমাকে এতো আজেবাজে কথা বলছে, আমি এখুনি এর একটা বিহিত করছি। "

এই কথা বলেই প্রচন্ড রাগের মাথায় অয়ন ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়, নয়নাও তাকে আটকানো জন্য তার পেছনে যায়। 

চলবে

গল্প : সুখের সন্ধান 

প্রথম পর্ব (০১)

3 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন