রান্নাঘর থেকে আসা বিকট শব্দে চমকে উঠলো অহম। টিভিতে একটা ভুতের সিনেমা দেখছিল। হঠাৎ এত জোরে শব্দ হওয়ায় ভয় পেয়েছে। বাইরে দমকা বাতাস শুরু হয়েছে। তারমানে ঝড়বৃষ্টি হতে পারে।
বুকে থু থু করে উঠে রান্না ঘরে গিয়ে দেখল বৃষ্টির ছাঁট এসে চুলার পাশে পানি জমে গেছে। আর বাতাসে খোলা জানালাটা বাড়ি খেয়েই শব্দ হচ্ছে। কিন্তু জানালাতো লাগানো ছিলো। হয়তো বাতাসে খুলে গেছে।
পাল্লা ধরে টেনে লাগাতে গিয়ে আঙুলে ছ্যাচা খেলো অহম। সাথে সাথে পানির কলের নীচে আঙ্গুলটা ধরল কিছু সময়। আজ একা বাড়িতে সব গন্ডগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। একটু আগে চুলায় চা বসিয়েছিল। বলগ উঠে পড়ে যেতে ধরতেই গরম পাতিল খালি হাতে ধরতে গিয়ে ছ্যাকা খেয়েছে। এখন আবার ছ্যাচা খেলো জানালায়।
অহম আজ বাড়িতে একা।
ওর মা বাবা বগুড়ায় ওর বড় বোন সোহানার বাড়িতে গেছে। সোহানার শশুর আব্বা হজে যাবেন। যাবার আগে আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দিয়েছেন। সেখানেই গেছেন। ফিরবেন আগামী কাল। রান্না মা করে দিয়ে গেছেন। শুধু গরম করে খাবে।
তিন বেডরুমের এই ভাড়া বাড়িতে অহম আর ওর মা বাবা থাকেন। ওর বোনের বিয়ে হয়েছে বগুড়ায়। অহম মাস্টার্স শেষ করে চাকুরীর চেষ্টা করছে। সেইসাথে টিউশনি করায় বেশ কয়েকটা।
জোরে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। সেই সাথে থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সবগুলো ঘরের জানালা চেক করল অহম। বন্ধ আছে। মা যাবার সময় বন্ধ করেই গেছেন।
রান্নাঘরে ঢোকা পানিটুকু একটা কাপড় দিয়ে মুছে নিলো অহম।
দশটা নাগাদ খেতে বসল। খাওয়া শেষ করে উঠবে ঠিক তখন ইলেকট্রিসিটি চলে গেলো।
বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো,
- ' ধূর বা*ল। '
চার্জার খুঁজে অন করে হাত ধুয়ে নিলো। এঁটো থালাবাটি সিঙ্কে রেখে বেঁচে যাওয়া খাবার ফ্রিজে রাখতে যাবে এমন সময় কলিংবেল বাজলো। এতো রাতে এই বৃষ্টির মধ্যে আবার কে আসল। বাবা মা কি চলে এলেন?
দরজা খুলতেই দেখল এক বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছে।এই গরমে চাদর দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা।
- ' একটু খাবার হইবো। সকাল থিইকা কিছু খাই নাই গো বাজান। '
- ' তার আগে বলুন এতো রাতে আপনি ঢুকলেন কিভাবে?গেটে নাই কেউ? '
লোকটা খুক খুক করে কাশতে লাগলো।
বিরক্ত হয়ে অহম বললো,
- ' এখন খাবার হবে না। শিগগির নিচে নেমে যান। '
দরজা বন্ধ করে দিয়েই মনে হলো এসেই যখন গেছিল বেঁচে যাওয়া খাবারটা দিলেই হতো। এতক্ষনে বোধহয় চলেও গেছে। তবুও কি মনে করে আবার বাইরের ঘরে আসলো।
দরজার খুলতেই আবারো ভয় পেল অহম। দেখল লোকটা একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যেন জানত যে অহম আবার দরজা খুলবে।
লোকটা খুক খুক করে কাশলো।
অহম বললো,
- ' একটু দাঁড়ান। '
দরজা লাগিয়ে ডাইনিং এ এসে খাবার গুলো একটা পলিথিনে ভরে লোকটার দিকে বাড়িয়ে দিলো। হাত বাড়িয়ে দিতেই খেয়াল করল লোকটার হাতে কালো রঙের আঠালোমতো কিছু লেগে আছে। খাবারটা নিয়েই চট করে হাত ঢুকিয়ে ফেললো বৃদ্ধ।
দেরি না করে দরজা লাগিয়ে দিল অহম। ঠিক তখনই কেমন ঠান্ডা লাগতে লাগল অহমের। একেবারে শীতকালে যেমন লাগে। জ্বর আসবে মনে হয়। সেইসাথে ভীষণ ঘুম আসছে। চোখ খুলে রাখতে পারছে না। কোনোরকমে নিজের ঘর পর্যন্ত গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। পায়ের কাছে রাখা কাথাটা টেনে নেবার শক্তি টুকুও পেলো না।
ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যেতে যেতে অহমের মনে পড়ল ওদের বাসায় তো কলিং বেল নাই। তাহলে ও কলিং বেল শুনলো কিভাবে!!
কিন্তু আর কিছুই ভাবতে পারলো না। গভীর ঘুমে হারিয়ে গেলো।
মাঝরাতে অস্বস্তি নিয়ে ঘুম ভাঙল অহমের। চোখ মেলতেই মনে হলো কেউ একজন পা টেনে টেনে হাঁটছে।
মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে। নিজের মনেই বলে উঠলো,
- 'ইঁদুর হবে হয়তো।'
পায়ের কাছে কাঁথা টেনে ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো অহম ।
ঠিক তখনই পাস থেকে শুনতে পেলো খুক খুক কাঁশির শব্দ।
এই ঘরের ভেতরেই তো মনে হচ্ছে।
আরে এটাতো ঐ লোকটার কাশি। সেই ভিক্ষুকের।এখন কেনো সে শুনতে পাচ্ছে।
ঘুমের ঘোরে কি সব চলছে ওর মনে।
অহম তার মোবাইলের টর্চ জ্বেলে শব্দের উৎসের দিকে যেতেই আতঙ্কিত হয়ে গেল ।
সেই বৃদ্ধ ভিক্ষুক ঘরের কোনায় জড়সড় হয়ে বসা। আলো পড়তেই খুক খুক কেশে বললো,
- ' বাইরে বড় জার করে গো বাবাজি। এই যে দেহেন। মাথায় এই ফাডা দিয়া হুহু কইরা বাতাস ঢুকে। '
অহম দেখল মাথায় ইঞ্চি খানেক জায়গা হা হয়ে আছে। আর গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে ওখান থেকে। কি বিভৎস! লোকটা উঠে দাঁড়ালো। আর কিছু বলার আগেই জ্ঞান হারাল অহম।
পরদিন চোখ খুলতেই দেখল মা উদ্বিগ্ন মুখ নিয়ে ঝুঁকে আছে ওর ওপর।
- ' কিরে,কি হয়েছিল তোর। কত করে নক করলাম। পরে লোক আনিয়ে তালা খুলে ঢুকতে হলো। এভাবে কেউ ঘুমায়!! '
বাবাও বসে আছেন। হাতে টিভির রিমোট। অহমের চোখ তখন চলে গেছে টিভি স্ক্রীনে। এক সংবাদ পাঠিকা পড়ছেন,
– ❝ গতকাল মহাখালীতে ওভারব্রিজের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে এক বৃদ্ধ ভিক্ষুকের মৃত্যু হয়েছে। সিঁড়িতে থাকা কলার খোসায় পা পিছলে এই দূর্ঘটনা ঘটে। মাথায় আঘাত পেয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল বৃদ্ধের। তার কোন আত্মীয় স্বজন না আসায় লাশ আঞ্জুমান মফিদুলে হস্তান্তর করা হয়েছে। ❞
অহম বিস্ফারিত চোখে দেখল গতরাতের সেই বৃদ্ধের ছবি টিভিস্ক্রীনে ভাসছে।
ওর মনে পড়ল গতকাল বিকেলে টিউশনি করিয়ে ফেরার সময় মহাখালীর ঐ ওভারব্রিজে উঠেছিল ও। ক্ষুধা লাগায় দুটো কলা কিনেছিল। খাওয়া শেষে হাতে থাকা কলার খোসাটা.....!
(সমাপ্ত)
#ছোটগল্পঃ #খোসা
