#রম্যগল্প


 পুষ্প ওড়না পরে না কখনো। আমি তাকে বললাম, ‘ওড়না পর, আজকের জন্য অন্তুত তুই ওড়না পর একটু প্লিজ।’


পুষ্প বললো, 

-- 'তুই  লুঙ্গি পরে বাহিরে-এ যাস, আমি কিছু বলি নাকি তখন তেকে? দিন দিন তুই টক্সিক হয়ে উঠছিস তো ।'


পুষ্প'র অনুমান সত্য না। আমি পুষ্প'র ওড়না নিয়ে ব্যস্ত হলাম কারণ আমার আসলে অন্য পরিকল্পনা আছে। যে শপিং মলে যাচ্ছি, সেখানে একটা বড়ো টেবিল ফ্যান লাগানো। যারা পাশ কেটে যায়, হাওয়ায় উড়ে যেতে যেতে বাঁচে কোনোরকমে। পুষ্পকে আমি .. পছন্দ করি। ওর আমাকে পছন্দ না। ওর পছন্দ হিরো। সিনেমার হিরো। আমি হিরো না। এভারেজ পিপল। কিন্তু একটা এভারেজ পিপলের হিরো হতেই বা কতক্ষণ লাগে? 


.


আমার পরিকল্পনা হচ্ছে পুষ্পকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ফ্যানের পাশে নিয়ে যাওয়া। তারপর কৌশলে ওড়নাটা ফ্যানের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া। পুষ্প'র গলায় টান খাবে ওড়না, প্যাঁচাবে, পুষ্প'র দম বন্ধ হয়ে আসবে, চোখ কোটর থেকে বের হয়ে আসবে, আমি এক হাতে ওড়না টেনে ধরে রাখবো, কেউ ফ্যানের সুইচ অফ করবে না, আমি উপায় না পেয়ে ওড়না কামড়ে ছিঁড়ে নেবো এবং পুষ্পকে উদ্ধার করবো। পুষ্প আমায় বলবে, অওও, তুই আমার হিরো। আমার মাথায় এত বুদ্ধি নেই। এই বুদ্ধি সিরিয়াল দেখে শেখা। পুষ্প'র গায়ে জোর করে ওড়না চাপিয়ে দিলাম তাই। আজ একদিনের জন্য নারীবাদ আমি দেখেও না দেখার ভান করে থাকবো।


.


পুষ্প শপিং-এ আসলো আমার সাথে। সাজগোজ ঐটুকুনই। ধারালো কাটা কাটা মুখচ্ছবি, কপালে টিপ, খোঁপা করা চুল। কপালের টিপ ছাড়া ওর বাড়তি সাজগোজের প্রয়োজন হয়নি কোনোদিন। আমাকে প্রায়শই শপিং-এ নেয় সে। ব্যাগ নেওয়ার জন্য। আজ আমি যেচে আসলাম। এসে প্রথমে ফ্যানের দিকে তাকালাম। শো শো করে ঘুরছে। কি যে ভালো লাগলো দেখে। 


পুষ্পকে ফ্যানের পাশের একটা দোকান দেখিয়ে বললাম, 

-- 'ওখানে ভালো জুতো পাওয়া যায়। চল।'


পুষ্প ঢ্যাং ঢ্যাং করে হেঁটে দোকানে চলে গেল। আমি ফ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। 


দোকানের কর্মচারী একজনকে ডেকে ফিসফিস করলাম, 

-- 'স্পিড একটু বাড়িয়ে দেওয়া যায় না?'


কর্মচারী চোখ কপালে তুলে বললেন, 

-- 'দুর মিঁয়া, জুতো কিনতে আসছেন নাকি ফ্যান?'


আমি তাকে খেদিয়ে দিলাম। নিজ হাতে স্পিড বাড়িয়ে দিলাম। ফ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে কাত হয়ে পড়ে যেতে যেতে সামলালাম। আনন্দে আমার বুকটা ফেটে গেল। আমি গুনগুন করে গান গাইলাম, 'আমারে উড়াইয়া দিও, ফ্যানের বাতাসে।' গান গাওয়ার সময় দেখলাম আমার কণ্ঠস্বর ভেঙে চুর্ণ চুর্ণ হয়ে যাচ্ছে ফ্যানের বাতাসে। কি সুন্দর, কি সুন্দর! আমি ফ্যানের সামনে মুখ নিয়ে কিছুক্ষণ গান গাইলাম। বুলবুলিও গাইলাম। 'বাগিচায় বুলবুলি তুই, ফুল শাখাতে, দিসনে আজই দোল।' শেষদিকে একটু টান দিলাম। জোরালো হাওয়ায় নিজের কণ্ঠস্বরের ভাঙন শুনে নিজেই মুগ্ধ। গান গাওয়া শেষে দেখলাম পুষ্প ফ্যানের পেছনে ভ্রুঁ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে।


-- 'তুই কি দিন দিন ল্যাদা হচ্ছিস?'


আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 

-- 'ল্যাদা কী?'

-- 'বাচ্চা। শিশু। ফ্যানের সামনে মুখ দিয়ে কী করছিস?'

-- 'কিছু না। তুই একটু আয় না এইদিকে, ওখানে কী করছিস? এখানে এসে একটু দাঁড়া।'


-- 'আমার মাথা খারাপ?'


পুষ্প রেগে গেল। আমি বুঝতে পারি না, এই মেয়ে চ্যাটাং চ্যাটাং রেগে যায় কেন? বললাম, 


-- 'আয় না, তোর একটা ছবি তুলি। সুন্দর ছবি আসবে।'


পুষ্প অবাক হলো।


-- 'দুনিয়ার এত জায়গা রেখে আমি ফ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে যাবো কোন দুঃখে?'


আমার মাথা গরম হয়ে গেল। কখন থেকে ফ্যানের সামনে একটু আনার চেষ্টা করে যাচ্ছি তাকে, আসতে চাচ্ছেই না। মনে হয় জোর করে উঠিয়ে আনা লাগবে। কিন্তু অত সহজে ধৈর্য হারালে চলবে না। সিনেমার হিরোদের প্রচুর ধৈর্য থাকে। ডিডিএলজে সিনেমায় শাহরুখ জানিয়েছিলেন, 'ধৈর্যই প্রেম, ধৈর্যই হাঙ্গা।'


আমি পুষ্পকে আদুরে স্বরে বললাম, 

-- 'তুই না ভালো চবি তুলিস, আমার একটা ছবি তুলেদে প্লিজ।'


পুষ্প হন হন করে হেঁটে আমার সামনে এলো। আমি ফ্যানের সামনে দাঁড়ালাম। পুষ্প ক্যামেরা অন করল। তারপর আমি আমার লুঙ্গিতে টান অনুভব করলাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম সর্বনাশ। ফ্যানের ভেতর লুঙ্গির কোনা ঢুকে গেছে। 


আমি দু'হাতে লুঙ্গি চেপে ধরলাম। পুষ্প ফোন ফেলে চিৎকার করে দৌড়ে এলো। প্রায় ঝাঁপ দিয়ে আমার লুঙ্গি চেপে ধরল। শপিংমলের মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখলো। কোন সভ্যতায় বসবাস করছি আমরা? একজন ওপর থেকে সাজেশন দিলো, লুঙ্গি ছেড়ে দেন, পাখায় প্যাচিয়ে অটোম্যাটিক বন্ধ হয়ে যাবে ফ্যান। কি আশ্চর্য। সুইচ টিপেও তো ফ্যান বন্ধ করা যায়। 


তারজন্য আমার লুঙ্গি খুলতে হবে? এটা কেমন ফ্যান, যেটা লুঙ্গি না খুললে বন্ধ হয় না এটা কেমন কথা হলো !


পুষ্প আমার লুঙ্গির এক পাশ চেপে ধরে জোরে জোরে টানতে টানতে বললো, 

-- 'তোরে এতবার করে বলছি লুঙ্গি পরিস তো পর ভালো কথা, একটা আন্ডারওয়্যারও তো পরতে পারিস নিচে৷'


ফ্যানের জোরালো বাতাসেও আমি দর দর করে ঘামলাম। পুষ্প আমায় অভয় দিলো। অত সহজে ন্যাংটো হতে দেবে না আমায় সে, খোদার কসম। ফ্যানের স্ট্যান্ডের নিচে দু'পা ঠেস দিয়ে আমার লুঙ্গির কাচা ধরে টানতে লাগলো পুষ্প। 


ফ্যানেরও শক্তি কম না। সেও টানলো। মানবশক্তি ও বৈদ্যুতিক শক্তি মিলে লুঙ্গি টানাটানি খেলায় শেষপর্যন্ত টেসলা জিতলো। আমি জ্ঞান হারালাম। যখন জ্ঞান ফিরল তখন আমার মাথা পুষ্প'র কোলে। লুঙ্গি নেই, পরনে ওড়না। পুষ্প আমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ফুঁ দিচ্ছে। বোধহয় আমার শ্বাস আটকে গিয়েছিল। 


শ্বাস না পাওয়া গেলে এইভাবে মুখে কৃত্রিম শ্বাস দেওয়া হয়। একটা সুন্দর উপভোগ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা। আমি চোখ খুললাম না। শ্বাস আটকে শুয়ে রইলাম। পুষ্প'র চোখে জল। আমার ভারী আনন্দ হলো। মনে মনে আমি গুনগুন করে বললাম , আমার প্রিয়া হবে এসো হে রানী দেবো খোঁপায় তারার ফুল গেঁথে ..'


(সমাপ্ত)..


#রম্যগল্প

----------

গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন। আর কমেন্টে আপনার মূল্যবান মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না যেন ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন