ভাইয়া ভাবির বিয়ে করেছে প্রায় হয়েছে এখন ভাইয়া ঠিক করলো এবার তাদের সংসারে নতুন অতিথি আনা মানে বেবি নেয়ার সময় হয়েছে। বাবা-মাও চায় এবার ঘরে একটা নতুন অতিথি আসুক নাতি-নাতনী আসুক যার সাথে তারা খেলা করবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাবি কারো কথাই শুনে না। যখনই ভাইয়া বাচ্চা নিতে চায় তখনই ভাবি ভাইয়ার উপর অনেক রেগে যায়। ভাবি কিছুতেই এখন বাচ্চা নিতে চায় না।
অথচ পাশের ফ্ল্যাটের বাচ্চা গুলোকে দেখলে সে কী আদর করে কাছে টেনে নেয়। ভাবি তো বাচ্চা অপছন্দ করে তেমনটাও নয়। তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
আজও ভাইয়ার সাথে ভাবির প্রচন্ড ঝগড়া হয়েছে। কিছু না খেয়েই ভাইয়া অফিসে চলে গেল। আর ভাবি চলে গেল তার খালার বাড়ি। বাবা-মায়ের কাছে না গিয়ে খালার কাছে কেন গেল? কারণ, ভাবি ছোট থেকে খালার কাছে মানুষ হয়েছে। তারাই ভাবিকে দেখেশুনে বিয়ে দিয়েছে। এখন যদি কেউ আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে যে ভাবি কেন মা হতে চায় না তাহলে সেটা একমাত্র ভাবির নিতু খালাই পারবে।
আমি আর ভাইয়া গেলাম ভাবিকে আনতে। আর নিতু খালার সাথে কথা বলতে।
নিতু খালা বললো,
- “ তোমরা তো সব কুছুই জানো নিশার বাবা-মা মারা অনেক আগেই না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে তাকে রেখেই । ছোট থেকেই তার জীবন অনেক দুঃখ কষ্ট আর নানান অশান্তির মধ্যে দিয়ে গেছে। আপা আর দুলাভাই তারা দুজনেই যখন আমাদের সবাইকে নিশির কথাটা আমাদের দিয়েছিলো তখন থেকেই আমরা সবাই ভীষণ খুশি ছিলাম। নিশির দাদা-দাদিও তাদের অনাগত নাতি-নাতনীর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। আপার তখন ভরা মাস। ওর শ্বশুর-শাশুড়ি চেয়েছিলেন এই সময় তাদের বউ তাদের বাড়িতেই থাকবে।
ডেলিভারির ডেট খুব কাছেই ছিল। এমন সময় একদিন সকালে আমাদের বাড়ি থেকে আপার কাছে বাবার মৃত্যুর খবর গেল। হঠাৎ স্ট্রোক করেই মারা গেল বাবা। দুলাভাই আপাকে নিয়ে তৎক্ষনাৎ বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু বাবাকে সেই শেষ দেখাটাও দেখতে পারেনি আপা। নিজেরাই লাশ হয়ে ফিরে এসেছে। রাস্তায় এক্সিডেন্টে পথেই দুলাভাই মারা যান। আপাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। নিশিকে বাঁচানো গেলেও আপাকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। একই দিনে তিন তিনটে মৃত্যু! তার কয়েকদিন পর নিশির দাদার হার্ট এ্যাটাক হয়। ছেলে আর ছেলের বউয়ের শোকে তিনিও সবাইকে ছেড়ে চলে যান।
নিশিকে ওর দাদি সহ্য করতে পারতেন না। সারাক্ষণ ডাইনি, অপয়া বলে গালাগালি করতেন। উনি ভাবতেন নিশিই অপয়া ছিল। তাই ওর আসার সাথে সাথে এত গুলো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এটা তো সত্যি নয় বলো। জন্ম মৃত্যু সে কী আমাদের কারো হাতে আছে!! এসব যিনি ঠিক করে রেখেছেন তার ইশারাতেই তো সব হয়েছে। কিন্তু ছোট থেকেই নিশিকে এই অপবাদ নিয়ে বাঁচতে হয়েছে। অপয়া, অলক্ষী তকমা নিয়ে বড় হয়েছে মেয়েটা। ও সবে মাএ পঞ্চম শ্রেণীতে পা রাখলো, তখন ও সবাই ওকে সবসময়ের মতোই আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিলো ।
পাড়া-প্রতিবেশীরাও কথা শোনাতে ছাড়তো না। একটা শুভ কাজে গেলে সেখান থেকে ওকে সরিয়ে দেয়া হতো। এই বলে যে, ও আসার আগে ওর বাবা-মাকে খেয়ে এসেছে। ওর জন্ম হওয়ার সময় এবং পরে চার চারটে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ও অলক্ষী, অপয়া। এভাবে ওকে সবাই তিরস্কার করতো। মেয়েটা ধীরে ধীরে একটা ট্রমার মধ্যে চলে যায়। অনেক কষ্ট করে ওকে বিয়ের জন্য রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো ভাবেই এই বিষয় টা থেকে বের করতে পারছিলাম না। ”
আমি আর ভাইয়া সমস্ত কথা শোনার পর একদম থমকে গেলাম। ভাবিকে অনেক ডক্টর দেখানো হলো। কিন্তু কিছুতেই তার এই ভয় কাটানো যাচ্ছে না। ভাবির মাথায় শুধু একটা ভাবনাই গেঁথে আছে। সে ভাবছে, তার বাচ্চা জন্ম নেয়ার সময় যদি সেও তার মায়ের মতো মারা যায় তাহলে তার বাচ্চাকেও একই ভাবে মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হবে। সবাই তার সন্তানকে অপয়া বলবে। সমাজের মানুষ তাকে অবজ্ঞা করবে। আর এই জন্যই সে মা হতে চায় না। বাবা-মা ছাড়া সন্তানদের জীবন কতটা যন্ত্রণার সেটা সে খুব ভালো করেই উপলব্ধি করেছে। অনাথ সন্তানদের মতো অসহায় মানুষ বোধহয় পৃথিবীর আর কোথাও নেই।
অনেক কষ্টে আমরা ভাবিকে একটু স্বাভাবিক করতে পেরেছি। অনেক ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয়েছে। অবশেষে ভাবি যেদিন আমাদেরকে সুখবর দিলো, সেদিন থেকে আমাদের বাড়িতে নতুন করে খুশি ফিরে এলো। কিন্তু আমাদের সবার খুশি দেখে ভাবি মাঝে মাঝে ভীষণ ভয় পেতো।
ডেলিভারির দিন ভাবি আমাদের সবাইকে বললো,
- “ আমার যদি কিছু হয়ে যা তোমাদের কাছে আমার একটাই চাওয়া তোমরা আমার বাচ্চাটাকে কখনো দূরে সরিয়ে দিও না। ওকে আমার মতো করে আলাদা করে দিও না। ওকে কখনে মায়ের শূন্যতা বুঝতে দিও না তোমরা। ”
আমি ভাবির হাতটা শক্ত করে ধরে বললাম,
- “ আল্লাহর আছে তার উপর ভরসা রাখো। তেমার কিছু হবে না। ”
'
'
আজকের সকালটা অন্যরকম। ভাবির জীবনের সবচেয়ে সুন্দর একটা সকাল। সে তার সমস্ত ভয়কে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে দুটো ফুটফুটে টুইন বেবির জন্ম দিলো। একটা ছেলে বাবু আর একটা মেয়ে বাবু। মা এবং বাচ্চারা তিনজনই সুস্থ আছে। বাচ্চাদের যখন ভাবির কাছে দেয়া হলো ভাবি তখন অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিলো আর ভাইয়াকে বলছিলো,
- “ আমি পেরেছি নিয়াজ। আমি হেরে যাই নি। আমি অপয়া নই তাই না বলো? ”
আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবির চোখেমুখে উপচে পড়া খুশি দেখছি আর ভাবছি, আমাদের অসুস্থ সমাজ কত সহজেই একটা মানুষকে ট্রমাটাইজ করে দিতে পারে। বিষ খেলে মানুষ মরে যায় কিন্তু মানুষের মুখের কথায় যেই বিষ থাকে সেই বিষ দিয়ে অনায়াসেই একটা মানুষকে না মেরেও মৃত্যুর মতো যন্ত্রণা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যায়। আমরা অন্তত এরকম একটা নিশিকে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের আশেপাশে এরকম কত নিশি আছে, যারা প্রতিনিয়ত সমাজের বানানো কুসংস্কার দ্বারা ট্রমাটাইজ হচ্ছে। তাদেরকে এই যন্ত্রণা থেকে কে মুক্ত করবে?
.
(সমাপ্ত)
-------------------
-------------------------------------
(গল্পটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না এবং নিয়মিত গল্প পেতে সাথে থাকার অনুরোধ রইলো)
#Bangla short story,#Bengali storytelling,#Bangla literature,#Bengali fiction,#Bangla narrative,#Bengali tales
#Bangla storytelling tradition,#Bengali literature classics,#Bangla literary works,#Bengali author spotlight,#Bangla literary scene,#Bengali story genres,#Bangla narrative styles,#Bengali storytelling techniques,#Bangla modern fiction,#Bengali historical stories,#Bangla fantasy tales,#Bengali narrative trends,#Bangla literary exploration,#Bengali storytelling heritage,#sahityakuthir
#ছোটগল্প ,#বাংলা গল্প ,#বাঙালি উপন্যাস #বাংলা ছন্দকাব্য#সুস্বাদু বাংলা গল্প, #বাংলা ভূতের গল্প, #বাঙালি প্রেমকাহিনী,#বাংলা মিষ্টি গল্প,#সত্যিকারের বাংলা কাহিনী,#বাংলা রহস্যগল্প,#বাংলা ঐতিহ্যবাহী গল্প,#বাংলা ফ্যান্টাসি গল্প,#বাংলা ভাষার উপন্যাস,#বাংলা গল্পের রচয়িতা, #সেরা বাংলা গল্প,#বাংলা বিজ্ঞান কাহিনী,#বাংলা ছোটগল্পের সমাহার, #সুবর্ণ বাংলা কবিতা, #বাংলা প্রবন্ধ,#বাংলা লেখিকা #সাহিত্য কুঠির



Your writing style is so engaging. I couldn't stop reading!
উত্তরমুছুন"This site is like a good book – hard to put down!"
উত্তরমুছুনYour writing is like a well-scripted play – every word contributes to the overall brilliance.
উত্তরমুছুনThis is bookmark-worthy material.
উত্তরমুছুন