----------
অয়ন রাগে খুব দ্রুত হাঁটতে শুরু করে, তার পিছনে নয়না তাকে আটকানোর বৃথা চেষ্টা করে। আমরিন এর ঘরে ইলিয়াস কে খুঁজে পেলো না অয়ন। তখন ইলিয়াস ইলিয়াস বলে জোরে চিৎকার করলে ঈনান বলে বাবা নানুর কাছে।
অয়ন তখন প্রায় দৌড়ে মায়ের ঘরে গেলো।
ইলিয়াস শ্বশুর আর শ্বাশুড়ি'র সঙ্গে গল্প করছে এক বিছানায় বসে, গল্পে তারা এতটা মগ্ন ছিলো যে অয়নের এতো চিৎকার তাদের কানে পৌঁছাতে পারে নাই।
ঘরে ঢুকেই অয়ন ইলিয়াসের শার্টের কলার ধরে তাকে বিছানা থেকে নামিয়ে দুটো চড় বসিয়ে দেয় গালে আর রাগে বলতে থাকে,
-- " তোর মা তুল্য ভাবি'র সাথে অশ্লীল আচরণ করিস তুই তোর তো সাহস কম না। "
ইলিয়াস অয়নের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে, তাড়াতাড়ি শ্বাশুড়ি মায়ের পিছনে দাঁড়ায়। অয়নের মা বলে,
-- " কি হইছে তোর আমাদের বাড়ির জামাইয়ের গায়ে শেষ পর্যন্ত হাত তুললি তুই, আমাকে খুলে বল সবকিছু। "
অয়নের মায়ের সাথে অয়নের বাবাও বলে উঠে,
-- " বল বাবা অয়ন কি অপরাধ ইলিয়াস এর। "
ঘরের ভিতরে দরজা থেকে একটু সামনে দাঁড়িয়ে আছে নয়না ঈনান কে কোলে নিয়ে, তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বাড়ির আর চারজন সদস্য।
.
অয়ন সব কথা সবার সামনে খুব চওড়া গলায় চিৎকার করে বলে আর ও ইলিয়াসকে মারতে অগ্রসর হয়, তখন মা এসে তাকে আঁটকায় আর বলে,
-- " এসব কথার সত্যতা কি অয়ন?ইলিয়াস বাবা তুমি বল এসব কি সত্যি? " (শ্বাশুড়ি মা)
-- " না আম্মা,এসব আমার নামে বানানো মিথ্যা কথা। আসল সত্যি টা কি জানেন..? , ভাবি আমাকে শুরু থেকেই সহ্য করতে পারে না।তার স্বামীর সংসারে অযথা বসে বসে খাই এটা যে উনি সহ্য করতে পারেন না এটা উনার মুখ দেখলেই বুঝতে পারি আমি। "
নয়ানা পাশ থেকে বলে,
-- " না মা এসব মিথ্যা কথা, এরকমটা আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই। "
-- " ঠিক আছে তুমি চুপ করো ইলিয়াস কে বলতে দাও নয়না। "
নয়না তার মাথা নিচু করে চুপ থাকে অয়ন একটু এগিয়ে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
-- " বল বাবা তার পর । "
-- " হ্যা মা , ওসব তো গেলো এখন ভাবি ইদানীং আমার দিকে কেমন একটা খারাপ দৃষ্টিতে তাকায় বুঝতেই পারছেন আপনি আমি কিসের কথা বলছি। সেদিন ঈনান কে আমার কোল থেকে নেওয়ার সময় বলে ভাই আপনার সাথে আমার কিছু গোপন কথা আছে।
আমি ভাবলাম, সামনে অয়ন ভাইয়ার জন্মদিন সারপ্রাইজ প্লান করবে হয়তো।
কিন্তু না আজ যখন আপনার মেয়ে গোসল করতে গেছে তখন ভাবি আমাদের ঘরে ঈনানকে কোলে নেওয়ার বাহানা করে যায় আর আমার হাত ধরে বলে আপনার ভাই তো আমাকে একটা সন্তান দিতে পারছে না, আপনি আমাকে একটা সন্তান এর সুখ দিন ইলিয়াস ভাই। "
.
নয়না এসব কথা শোনার পর কান চেপে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ে। অয়ন আবার তেড়ে গিয়ে ইলিয়াসের নাক বরাবর ঘুসি মারে আর বলে,
-- " আমার বউ কে আমি ভালোমতোই চিনি ওর নামে এতো মিথ্যা কথা ঘুরপাক খায় তোর মাথায় রাতে ঘুমাইস কিভাবে। এখুনি বের হয়ে যাবি এ বাড়ি থেকে আর আমার বউ কিরকম সেটা আমি তোর থেকে ভালো জানি, তুই মিথ্যা অপবাদ দিলেই তো আর সেটা সত্যি হয়ে যাবে না। এই মূহুর্তে একা বের হয়ে যা এ বাড়ি থেকে। "
ইলিয়াস চুপ করে আছে, তখন তার শ্বাশুড়ি মা বলে,
-- " ইলিয়াস কেন যাবে গেলে যেতে হলে এ বাড়ি থেকে তোর বউ যাবে অয়ন। "
নয়না সেখান থেকে নিজের ঘরে চলে আসে, অয়ন ও তার সাথে আসে। অয়ন কে জড়িয়ে ধরে নয়না জোরে জোরে কাঁদতে থাকে আর বলে,
-- " সব মিথ্যা কথা গো, তুমি ওসব জঘন্য কথা বিশ্বাস করো না। "
-- " আমি জানি তুমি কেমন নয়না, তোমাকে কিচ্ছু বলতে হবে না, এবার চোখের পানি মুছে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেও আজকেই চলে যাবো এ বাড়ি ছেড়ে আমরা। "
অয়ন ঘর থেকে বেড়িয়ে বাবার কাছে যায় আর বলে তারা চলে যাচ্ছে আজ।
-- " আজ কোথায় যাবি রে বাবা অয়ন তার থেকে ভালে হয় তুই কাল সকালে যা আর তোদের সকল দায়িত্ব এখন থেকে আমার তা নিয়ে তুই কোনো চিন্তা করিস না । দুরে গেলেই ভালো থাকবি তেরা বউমা সহ তুই, আমি মাঝে মধ্যে হয়তো যাব তোদের দেখতে। "
এই কথা শোনার পর অয়ন বাবকে জড়িয়ে ধরে, বাবাও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
এতো কিছু ঘটে গেলো আমরিন যেন কিছুই বুঝতে পারলো না, ঈনানকে নিয়ে মহা আনন্দে খেলছে সে। ইলিয়াস শ্বাশুড়ি মায়ের কাছেই বসে আছে মারের ভয়ে আবার যাদি অয়ন তাকে মারতে আসে।
.
নয়না রাতের মধ্যে সব গোছগাছ শেষ করলো, এ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে তার মন সায় দেয় না কিন্তু এতো অপমানের পর এখানে থাকা সম্ভব নয় তার পক্ষে।
পরদিন সকালে তারা চলে যায় বিদায় নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে, শ্বাশুড়ি মায়ের পায়ে সালাম করে নয়না যাবার বেলায় মুখ তুলে তাকায় না পর্যন্ত তিনি তখন নয়না আর অয়নের দিকে।
চলে আসার সময় পিছন ফিরে বার বার তাকায় নয়না বাড়ির দিকে। বাবা গাড়ি ঠিক করে রাখে কাল রাতেই, বাড়ি থেকে একশত কিলোমিটার দূরে একটা শহরে এসে পাড়ি জমায় তারা। বাসা খুঁজে পেতে একদিন সময় লাগে তাদের, নতুন বাসায় উঠার পরদিনই অয়নের বাবা ঘরের আসবাবপত্র সহ প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র একটা ট্রাকে করে পাঠিয়ে দেয়।
.
খারাপ লাগা টা বেশিক্ষণ থাকে না তাদের মাঝে, দুজনের সংসার বেশ ভালে ভাবেই চলছে তাদের। এরমধ্যে অয়নের বাবা এসে যায় একদিন আর অয়নকে এই শহরেই একটা ব্যবসা করার সকল ব্যবস্থা করে দিয়ে যায়।
.
তারা একটা দোতলা বাড়ির উপর তলায় ভাড়া থাকে আর নিচ তলায় বাড়ির মালিকরা থাকেন। রোজকার মতো আজও অয়ন ফজরের নামাজ মসজিদে আদায় করে বাইরে হাঁটে অনেকক্ষণ তারপর বাসায় আসে। আজ বাসার গেট খুলতেই তার চোখে পড়ে একটা দুই কি তিন বছরের ছোট মেয়ে, বাসার সামনের ফুলের বাগানের পাশে এই শীতে মাটিতে বসে খেলছে। বাচ্চাটার গায়ে কোনো শীতের পোশাক নেই শুধু একটা হাতকাটা গেঞ্জি পরিহিতা। ঠান্ডাও কি লাগছে না বাচ্চাটার অয়নের খুব মায়া লাগে, একপা দুপা করে অয়ন বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে যায়।
-- " কি নাম তোমার বাবু, তোমার বাড়ি কোথায়। "
তখন মালিকের বাড়ির ভিতর থেকে এক অল্পবয়স্কা সুন্দরী মেয়ে বের হয়ে আসে দেখেই বুঝা যাচ্ছে এই ছোট মেয়েটার মা সে।
-- " স্যার ওর নাম মিষ্টি আমার মেয়ে ও, আমি এ বাড়িতে কাজ করি। "
-- " আচ্ছা তো এই শীতে মেয়েকে একা বাইরে দিয়েছেন কেন ওর ঠান্ডা লাগবে তো আবার। "
- " আমরা গরীব মানুষ বাবা আমাদের ঠান্ডা লাগে না আর বাচ্চা সহ কাজে যাওয়ার নিয়ম নাই ওখানে তাই এ বাড়িতে মিষ্টি বাইরেই খেলা করে সবসময়। "
-- " আচ্ছা, আমি আর আমার স্ত্রী উপর তলায় ভাড়া থাকি নতুন এসেছি আপনার মেয়েটাকে কি আমরা একটু নিয়ে যেতে পারি। "
-- " তা নিয়া যান তবে ওরে কিছু একটা খাইতে দিয়েন যেন স্যার, সকাল থেকে ও কিছু খায় নাই মাইয়াডা আমার । "
-- " ও চিন্তা করবেন না মিষ্টি যা খেতে চাইবে তাই খাওয়াবো ওকে, এই বলে মিষ্টি কে কোলে তুলে নেয় অয়ন যদিও বাচ্চাটার গা মাটি দিয়ে অর্ধপূর্ণ ছিলো তাও সে কোলে তুলে নিল । "
.
-- " নয়না নয়না উঠো ঘুম থেকে এই দ্যাখো কে এসেছে, "
নয়না গা মুড়িয়ে উঠে বিছানা থেকে। হঠাৎ তার স্বামীর কোলে এমন ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চা দেখে তার ভিতর মাতৃত্ব জেগে উঠে। বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেয় সে অয়নের কোল থেকে আর বলে,
-- " হাত পা সব ঠান্ডা যে মেয়েটার গো, কই পেলে একে। "
-- " আর বলো না, ওর মা কাজ করে মালিকের বাড়িতে কিন্তু বাড়ির ভিতরে নাকি বাচ্চা নিয়ে কাজ করার নিয়ম নাই কি আজব মানুষ বলো কোলের বাচ্চাটাকেও মায়ের থেকে আলাদা করে রাখছে। "
-- " সে যাই হোক তুমি আজ ওর জন্য কিছু নতুন কাপড় কিনে এনো, ইস কতো ঠান্ডা পাচ্ছে মেয়েটা। "
-- " ঠিক আছে আমি এখন দোকানে যাব তুমি মেয়েটাকে কি খেতে চায় খাওয়াও ওকে। "
-- " কি নাম তোমার মা "
মিষ্টি বলে ওর নাম আর ডিম খেতে চায়৷ নয়না মিষ্টি কে ডিম সিদ্ধ করে খাওয়ায় আর তারপর খিচুড়ি রান্না করে মিষ্টির জন্য।
মিষ্টি সহ ঘুমিয়ে পড়েছে নয়ন দুপুরের খাবার খেয়ে উঠার পর পর এমন সময় কলিং বেল বাজায় মিষ্টির মা সে তার বাড়িতে যাবে মিষ্টি কে নিতে এসেছে।
-- " আপা এ আপনার মেয়ে, "
-- " হ্যা আপা এ আমারি মেয়ে বাপ হারা , অন্য বাড়িতে কাজে যাব মেয়েটারে দেন নিয়া যাই আমার সাথে । "
-- " কেন ওর বাবা কই? "
-- " ওর জন্মের একমাস পরই ও নিখোঁজ হয় অনেক খোঁজ করছি পাই নাই তাকে , মানষে বলে অন্য দেশে আর একটা বিয়া করে নিয়েছে নাকি। "
ঘুমের বাচ্চাটাকে নয়না নিজের কোল থেকে তার মায়ের কোলে তুলে দেয়।
মিষ্টি চলে যাওয়ার পর খুব শূন্যতা অনুভব করে সে, বিষন্ন মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইস আজ যদি তার এমন একটা সন্তান থাকতো।
.
মিষ্টি কে রোজ এভাবে নিয়ে আসে অয়ন, আর নয়নার সময় কাটে মিষ্টির সাথে অয়ন বাইরে চলে যাওয়ার পর। মিষ্টি নিজে থেকেই মা বাবা বলে ডাকে তাদের, এই ডাকে নয়নার বুক কেঁপে উঠে যতবারই শুনে ততবার। অনেক খেলনা আর নতুন কাপড় কিনে দেয় মিষ্টি কে তারা, মিষ্টি কে তার মা নিতে আসলে সে যেতে চায়না কান্না করে তবুও জোর করে নিয়ে যায় মা তাকে।
এভাবে ছয়মাস কেটে যায়, মিষ্টি কে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলে নয়না। একপর্যায়ে তারা মিষ্টি কে দত্তক নিতে চায়, কিন্তু মিষ্টির মা তাতে নারাজ
মিষ্টিকে আর নয়নার কাছে আসতে দেয় না, কিছুদিন কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায় না মিষ্টির।
এরমধ্যে নয়না অন্তঃসত্ত্বা হয় তার ভিতরে বেড়ে ওঠে নতুন প্রাণ এতো অপেক্ষার পর তবুও সে মিষ্টি কে ভুলতে পারে না রাতে স্বপ্নে দেখে মিষ্টির অনেক বিপদ।
হঠাৎ একদিন খবর পায় অয়ন মিষ্টির মা নিখোঁজ কোথায় গেছে কেউ জানে না , অয়ন তখন মিষ্টি কে চিরদিনের জন্য সেখানকার সকলে সাথে বৈঠক করে নিয়ে আসে।
নয়না মহাখুশি মিষ্টি কে পেয়ে তার দুটো সন্তান হবে এখন, এতো দিনে আল্লাহ তাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে।
.
বিকেল বেলা নয়না মিষ্টি কে তার কেলে নিয়ে বেলকনিতে বসে আছে, অয়ন তাদের জন্য নাস্তা তৈরি করে নিয়ে আসে একসাথে বসে খায় সবাই।
এমন সময় হঠাৎ অয়নের বাবা মোবাইলে কল দিয়ে বলে,
-- " ইলিয়াস থাপ্পড় মেরে বাড়ি থেকে বের করে দিলো আজ তার মা । বাড়ির কাজের মেয়েটার সাথে অশ্লীল আচরণ করার সময় তা নিজের চোখে দেখেছে মা । তোর মা তো এখন বউমা বউমা করছে শুধু, নিজের ভুল বুঝতে পেরে। "
(সমাপ্ত)...



"I appreciate the diversity of voices represented on this platform."
উত্তরমুছুনThe subtle use of animation enhances the overall user engagement.
উত্তরমুছুন"Finally, a site that understands user experience!"
উত্তরমুছুন