পরিবার নামক জালটা


 আমাদের একটা বাচ্চা হওয়ার পর থেকে কেন যানি স্ত্রীর প্রতি আমার একধরনের অনিহা আসা শুরু হয়েছে। আগের মত তার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করিনা; তার শরীরের স্পর্শ, তার সোন্দর্য কোনোকিছুই আমাকে আর আগের মতো আকৃষ্ট করেনা।


আমি বুঝতে পারি,তাকে আর আমার আগের মত ভালো লাগছে না।তার শারিরীক গঠন, এমনকি কথার ধরন সবকিছুই কেন জানি তিক্ত লাগে। সুহাসিনী, সুশ্রী, রূপবতী,মায়াবিনী বলে সবসময় যার প্রসংশা করে এসেছি এখন সেই প্রসংশা তো দুরের কথা মাতাল করা সেই শরীরের ঘ্রাণ টাও এখন আমার কাছে বিশ্রী লাগে। এমনকি সে ভালোবেসে কোনকিছু করতে গেলেও আমার পছন্দ হওয়ার পরিবর্তে বিরক্তি মনে হয়।


এসব কথা তাকে মুখ ফুটে বলিনি। যদি কষ্ট পায়। তবে আকার-ইঙ্গিতে কয়েকবার বুঝাতে চেয়েছি। কিন্তু সে বুঝতে চায় না,নাকি বুঝেও না বুঝার ভান ধরে সেটাও বুঝি না। 


সে থাকে সারাক্ষণ আমাদের মেয়েকে নিয়ে আর আমি থাকি আমার কাজে ডুবে। যে যার মত করে কেটে যাচ্ছে দিনগুলো।মাঝেমধ্যে রাত নামলে ভালোবাসতে যে ইচ্ছা করেনা তাও নয়। ইচ্ছা করে,কিন্তু অদৃশ্য এক বেড়াজাল এসে আঁকড়ে ধরে সেই মূহুর্তে। এভাবেই চলছে দোটানায় দিনগুলো। 


এরই মাঝে একদিন অফিসের এক গেট টুগেদার পার্টিতে গিয়ে নাদিয়া নামের একটা মেয়ের সাথে পরিচয় হলো আমার। মেয়েটা দেখতে যেমন সুন্দরী তেমনি তার মনকাড়া চাহনি। ডায়েট কন্ট্রোল করা স্লিম ফিগার আর পাকা গমের মত নিখুঁত ত্বক। এক পলক দেখাতে যে কোনো পুরুষ তার রুপের তীক্ষ্ণ ছুরির আঘাতে ঘায়েল হতে বাধ্য! স্লিভলেস ড্রেস সামনে আসলে তার দিক থেকে নিজের নজর যেন ফেরানো দায় হয়ে পড়ে।


পার্টির এক পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম,ঠিক তখনি মেয়েটা নিজ হতে এগিয়ে এসে বললো,


-- " আপনি আদিব। রাইট? "


নাদিয়াকে প্রথম দেখাতে কিছুক্ষণের জন্য যেন পুরো পৃথিবী থমকে গিয়েছিলো আমার। নিভু নিভু আলোর মাঝেও এক ফালি চাঁদের দেখা পেয়ে চোখজোড়া ঝলসে উঠেছিলো একমুহূর্তের জন্য।


কাজল কালো গহীন অরণ্যে ঘেরা দুটি চোখ, সরু ভুরু জোড়া যেন তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মত সরে গিয়েছে ওপাশে। ভোরের ফুটন্ত সতেজ গোলাপের পাপড়ির মত ওষ্ঠজোড়া। শরীরে গাঢ় খয়েরী রঙের ওয়েস্টার্ন পোষাক জড়ানো।পার্টিতে জলতে থাকা লাল আলোতে যেন আগ্নেয়গিরির জলন্ত লাভার মত দেখাচ্ছে মেয়েটাকে!


আমাকে চুপ থাকতে দেখে মেয়েটা আবার বললো, 

-- " কি হলো কথা বলছেন না যে? ভয় নেই আমি অপরিচিত কেউ নই। আপনাদের অফিসেই ডিজিটাল মার্কেটিং এনালাইসিস পদে নতুন জয়েন হতে যাচ্ছি। আপনাদের এমডি স্যার আমার আংকেল। তার আমন্ত্রণেই আজ এখানে এসেছি। "


মেয়েটার রুপের মোহ যেন আমার বাকশক্তি কেঁড়ে নিয়েছে, বাকরুদ্ধ নয়নে কোনরকম ঘাড় নাড়িয়ে বুঝালাম,হ্যাঁ আমিই সেই অধম।


-- " আমার নাম নাদিয়া। আর আমার সাথে এত ফর্মালিটি দেখানোর কোনো দরকার আমি মনে করি না । কারণ আগামীকাল থেকে তো আমরা একসাথেই কাজ । "


এভাবেই নিজ হতে মেয়েটা এসে আমার সাথে পরিচিত হলো। কিছুক্ষণ কথোপকথনের এক পর্যায়ে ফেসবুকেও এড করে নিলো। তারপর দু চারটে কথা বলার পর যে যার মত করে আবার পার্টিতে জয়েন করলাম। 


.


পার্টি থেকে এসে আমি ক্লান্ত শরীর মিয়ে বিছানাই শুয়ে আছি এমন সময় মেসেঞ্জারে শব্দ করে একটা নোটিফিকেশন আসলো ।


মোবাইলের লক খুলতে দেখি নাদিয়া মেসেজ করেছে, 

-- " হাই হ্যান্ডসাম। কি করেন? "


ফোনটা হাতে নিয়ে টাইপ করলাম, 

-- " এইতো শুয়ে আছি। আপনি? "


-- " আমিও। আচ্ছা আমাকে কি আপনার ৬০ বছরের মহিলা মনে হয়? "


আমি মনে মনে হাসলাম,তারপর লিখলাম, 

-- " না। তা কেন হবে! "


-- " তাহলে আপনি আপনি করছেন কেন? আপনার মুখে আপনি ডাক শুনে নিজেকে ষাট বছরের মহিলা মনে হচ্ছে। "


-- " তাহলে কী বলে সম্বোধন করবো? "


-- " কেন তুমি করে বলবো। আমি কি 'তুমি, করে ডাকার জন্য একবারেই উপযুক্ত না  বলো ? "


আমি আবার মৃদু হাসলাম,তারপর রিপ্লাই দিলাম, 

-- " আচ্ছা ঠিক আছে। এখন থেকে তাহলে আর আপনি করে বলবো না । "

.

নরমাল কথপোকথন চললো কিছুদিন।

এদিকে অফিসের বস নতুন একটা প্রজেক্টের জন্য নাদিয়াকে আমার গ্রুপে দিয়ে দিয়েছে। ফলে বেশিরভাগ সময় নাদিয়ার সাথে থাকতে থাকতে অল্পকিছুদিনের ভিতরে একে অপরের ভিতরে বন্ধুত্বসুলভ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলো। মেয়েটার মায়াবী চোখের চাহনি আর কথা বলার ধরণ সবকিছুই আমাকে কেন যানি আকৃষ্ট করে। মনের মাঝে নতুন করে ভালোবাসার জন্ম দেয় আবার।নিজেকে বুঝ দেই, এসব ঠিক না। আমার ঘরে স্ত্রী আছে একটা ছোট বাচ্চা মেয়ে আছে।


ইদানিং নাদিয়ার স্পর্শকাতর চাহনি আর মুখের ভাবমূর্তি আমার বেশ সন্দেহজনক লাগছে। মেয়েটা জানে আমি বিবাহিত আমার একটা বাচ্চা পর্যন্ত আছে,তারপরও কেন যে এমনটা করছে বুঝতে পারছিনা।


.


সেদিন রাতে সব ধোঁয়াশা দুর করে দিলো নাদিয়ার দেওয়া একটা কয়েক কথার ছোট্ট মেসেজে।সে সোজাসাপটা আমাকে প্রপোজ করে বসেছে।

মেসেজটা ফোনের স্ক্রীনে জলজল করছে,রিপ্লাই দেওয়ার সাহস পাচ্ছিনা। সুন্দরী মেয়েদেরকে ইগনোর করবার মত সাহস পুরুষ মানুষের বরাবর একটু কমই থাকে। আর নাদিয়ার মত মেয়েকে তো একবারেই নয়। হ্যাঁ বা না কোনটাই বললাম না।


পরদিন সকালে অফিসে গিয়েই দেখি নাদিয়া ডেস্কের পাশে এসে দাঁড়িয়ে খানিকটা ঝুঁকে মুখের কাছে এসে বললো,


-- " এইযে মিস্টার শুনেন ,  আমি কিন্তু আমার উত্তর পাইনি । "


এইভাবে চললো কয়েকটা দিন। কিন্তু নাদিয়ার মত মেয়েকে বেশিদিন এড়িয়ে চলা কোনো পুরুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।তাকে বললাম, 


-- " দেখো আমি বিবাহিত,আমার একটা মেয়ে আছে। "


নাদিয়া বিষয়টাকে খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়ে বললো, 

-- " তাতে কি হয়ছে। আর এমন একটা ভাব দেখাচ্ছো মনে হচ্ছে তুমি তোমার সংসার জীবনে খুব হ্যাপি! স্ত্রীর সাথে কবে মন খুলে সুখ দুঃখের কথা বলেছো মনে আছে তোমার ?আদিব আমি তোমার সুখের কারণ হতে চাই। প্লীজ! "


এভাবে চললো আরও কিছুদিন। কিন্তু কথায় আছে না লোহা আর চম্বুক একসাথে থাকলে বেশিক্ষণ সরে থাকতে পারেনা।শেষমেশ নাদিয়ার রূপের মোহে নিজেকে ধরা দিয়েই দিলাম। মেয়েটা বেশ চঞ্চল, আমি কখন কি চাই না চাই বলার আগেই বুঝে ফেলে সে। এমন কাউকেই তো চেয়ে এসেছি আমি।

ওর স্পর্শকাতর আলিঙ্গন আমার পুরুষত্বকে নাড়িয়ে তোলে বারবার। ইচ্ছে করে সব ভুলে গিয়ে নাদিয়ার প্রেম দরিয়ার মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিন্তু ঝাঁপ দেওয়ার কথা মাথায় আসলেই আমার পরিবার নামক জালটা এসে আষ্টেপৃষ্টে ধরে তখন। নিজেকে সংযত করে নেই আবার।


.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন