≈ গল্পঃ মাইশা মৃত্যু ≈ পর্ব - [ ০৩ ]

 


≈ গল্পঃ মাইশা মৃত্যু ≈

পর্ব - [ ০৩ ]

--------------------------------

আলমারির দরজা খোলাল আর ভেতরে দুইসেট স্বর্ণ গহনার একটা ও নেই। খালি বাক্স পড়ে আছে আর আমার এতোদিনে চোখে পড়লো না?চুরি হয়েছে আমার বাড়িতে? রহস্যের একটা নতুন মোড় নিলো।

তারমানে আগে চুরি তারপর ধর্ষণ তারপর খুন??মুহূর্তেই মাথাটা গরম হয়ে গেলো। সামনে গোল টি-টেবিলে রাখা কাচের গ্লাস টা ধরে নিয়ে ফ্লোরে ছুঁড়ে মারলাম। গ্লাসটা ভেঙে টুকরোটুকরো হয়ে গেলো। শরীরটা খুব দূর্বল লাগলো। বিছানায় গিয়ে বসলাম।না না....এটার সব পূর্বপরিকল্পিত। আমি সবকয়টারে দেখে ছাড়বো। নিজের অজান্তেই কথাগুলো প্রলাপ করতে লাগলাম।

ডানপাশে বিছানায় রাখা ফোনটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখি নাঈমার ফোন। উফফ মেয়েটা কি আমাকে একটু স্বস্তি দিবে না দেখছি। দূর্বল শরীরে অনেটা ক্লান্তি আর বিরক্তি নিয়ে ফোন রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।এটা ঠিক নাঈমার ঢং কান্না আমি যাবোনা বলেছি তাই। কিন্তু নাঈমা দেখি কেঁদেই যাচ্ছে। আমি বেশ অবাক হোলাম।

- হ্যালো নাঈমা? কি হইছে এভাবে কাঁদছো কেন? কি হয়েছে?

- দুলাভাই??

এতটুকু বলে আবার কান্না শুরু।আমার ভয় ও করতে লাগলো।আবার অন্য  কিছু হলো না তো  ? বেশ চিন্তিত স্বরে বললাম,

- হ্যাঁ বলো কি হয়েছে কি? এভাবে কান্না করছো কেন?

কিছুক্ষণ পর একটু নীরব থেকে নাঈমা বললো,

- দুলাভাই? আপনি আসবেন না? আপনার সাথে একটা জরুরী কথা ছিলে একটু। আমার বোনের দোহাই লাগে।

নাঈমাকে এভাবে বলতে শুনে আমি বুঝতে পারলাম ওর সাথে হয়তো কিছু একটা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। কি হয়েছে নাঈমার?  আমি বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দ্রুত কথা বলতে লাগলাম দ্রুত বলতে গিয়ে জিব্বায় কথা আটকে গেল । অনেকটা তোতলিয়ে বললাম,

- মা...মানে? কি হ...য়েছে নাঈমা? এখনই আমাকে বলো।

- না আপনাকে সরাসরি বলতে হবে আমার। আপনি না আসলে আমার  হয়তে ক্ষতি হয়ে যাবে দুলাভাই। প্লিজ একটু এদিকে আসেন একবার।

আমি তো এখন এক মহা মুসিবতের মধ্যে পড়ে গেলাম ।  দিন যত যাচ্ছে রহস্যের মোর ততই ঘুরছে আর ওদিকে নাঈমার ব্যাপার তোমার জন্য খুব চিন্তার, এই মুহূর্তে কি করবো আমি ? কি বা করা উচিৎ  কিছুই ঢুকছে না। কিছুক্ষণ পর ভাবলাম।  নাহ এখনি নাঈমার ওখানে মানে যেতে হবে। কিন্তু কেন জানি একটা পিছুটান কাজ করছে আমার মধ্যে ।

আমি কাদের ভাইকে ফোন দিলাম। উনি অফিসে যাওয়ার সময় পাশের বাসার ভাবীকে নক দিয়ে বলে দিলাম , পুলিশ আসলে বলতে যে আমি মাইশার দোয়া - মাগফিরাতের জন্য আমার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি।

.

বাস থেকে নেমেই দেখি শ্যালক তারেক আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। তারেকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম কিছুটা লজ্জিত ভাব নিয়ে  লাগেজ টার হাতল টেনে বড় করছে। আমি বুঝতে পারলাম মাইশার মৃত্যুর দিনে ও যে আমাকে ও ঘুষি মেরেছিলো তার জন্য লজ্জিত। আমি আমার ডান কাঁধে হাত দিয়ে দেখলাম ব্যথাটা এখনো আছে কি না। আঙ্গুল দিয়ে হালকা চাপ দিতেই বেশ ব্যথা অনুভূত হলো। এতোদিন এক ঘোরের মধ্যে থাকায় এদিকে আর খেয়াল করা হয়ে ওঠেনি।

একটা অটোতে উঠলাম আমরা।সারা পথ তারেক মাথা নিচু করে আছে একবারো তাজায় না। আমি টুকটাক কথা বললাম ওর সাথে কিন্তু কেবল জবাব টুকুই পাচ্ছিলাম অন্য কেন কথা সপ বলেনা ।ভালোবাসার বোনটাকে হারিয়ে হয়তো সে এখনো ও মর্মাহত। আর আমি ? আমি কি মাইশাকে ছাড়া ভালো আছি? সারাক্ষণ একটা কষ্ট আমার বুকের ভেতর চেপে বসে আছে। না পারি তা উজাড় করে কারো কাছে শেয়ার করতে না পারতেছি কান্না করতে। না পারি সহ্য করতে। হৃদয়ে যেন কেরোসিন ঢেলে ধাও ধাও করে আগুন  জ্বালাচ্ছে কেউ সারাক্ষণ। কে জ্বালাচ্ছে? কেন জ্বালাচ্ছে?

.

শ্বশুর বাড়িতে একটা রুমে একা বসে আছি আমি। আমি এসেছি দেখে নাঈমা খুশিতে আত্নহারা হয়ে গেছিলো প্রায়। নাঈমার এই খুশির ভেতর অন্য কিছু দেখতে পেলাম । এই খুশিটা যেন সে নিজেকে নিজের মতো পাবার খুশি। কিন্তু আমার উপস্থিতি কেন ওকে এতো খুশি করছে? নাঈমার বয়স এই ১৮ ছুঁয়েছে প্রায় ভরা যৌবন চোখে সব কিছুই রঙিন এখন তার। মেয়েটা মনে মনে অন্যদিকে এগোচ্ছে না তো আবার?

ধুর.,,,,,আমি এসব কি ভাবতেছি । হঠাৎ আমি দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম  হয়তোবা আমার শ্বশুর আসছে বিষয়টা বুঝতে পেরে আমি আগে থেকেই দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু দেখি আমার শশুর না  নাঈমা এসেছে । ঘরে ঢুকেই নাঈমা দরজা লক করে দিলো। নাঈমাকে এভাবে দরজা লক করতে দেখে আমি একটু দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম।নাঈমা এসে আমার পাশে বসলো। আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলছে নাঈমা।ওর অপরূপ চোখ দুটোর মাঝে যে কোন ছেলে হরহামেশাই ডুবে যাবে। হারিয়ে ফেলবে নিজেকে। যেন জাফলং এর অপরূপ প্রবাহমান ঝরনাধারা ওর দুই চোখের মধ্যে।

চোখেমুখে বেশ উৎসাহ নিয়ে নাঈমা বললো,

- দুলাভাই? যা বলবো মন দিয়ে শুনবেন কিন্তু।

- হ্যাঁ অবশ্যই। বলো?

- আপুর মৃত্যুর দুই দিন পর একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোনে কল আসে।

- তারপর?

- আমি কলটি রিসিভ করি। দেখলাম মধ্যবয়সী ছেলের কণ্ঠ হবে ।

- তারপর কি বললো সে?

- শুনবেন তো আগে আমার কথা। ফোন দিয়েই ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করলো লেকটা। আপুর কোথায় দাফন হয়েছে এসব জিজ্ঞেস করলো।আমি ভাবলাম আব্বু-আম্মুর কোন আত্নীয় হবে মনে হয়

আমি একটু উঠে বসলাম। নাঈমার কথা বলার ভঙ্গী আমাকে আরো মনোযোগী করে তুলছে।

আগ্রহের স্বরে বললাম,

- তারপর?

- কিন্তু ঠিক তার পরের দিন ওই ছেলে অন্য নম্বর থেকে ফোন দেয়। বেহুদা আলাপ জমাতে চায়। এটা বুঝতে পেরে আমি ফোন কেটে দেই। তারপর গতকাল আর একটা অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন  দিয়ে লোকটা যা বললো তার জন্য আমি মেটেও প্রস্তুত ছিলাম না দুলাভাই।

আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম,

- কি বললো সে?

- প্রথমেই ফোন দিয়ে লোকটি আমার সাথেআলাপ জমাতে চায় আমি কেটে দিতে চাইলে 

হঠাৎ করেই লোকটি আমাকে গালি দেওয়া শুরু করে।

ওয়েট ওয়েট বলে আমি নাঈমাকে চুপ করিয়ে দিলাম।

বললাম,

- তার ভাষা কেমন ছিলো? মানে ভাষার মধ্যে কি কোন আঞ্চলিকতা ছিলো?

নাঈমা কিছুটা ভেবে বললো,

- নাহ। নইলে তো বুঝতে পারবো।

- আচ্ছা। তারপর বলো?

- যখন লোকটা গালাগালি করা শুরু করে আমি তখন  রাগের মাথায় তাকে বলে ফেলি আপনার নাম্বার আমি পুলিশের কাছে দেব। এই কথা বলার পর সে আমাকে ভয় দেখানো শুরু করে দুলাভাই।

থ্রেডের কথা শুনে আমি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারতেছি না। তার কথাগুলো শোনার পর থেকে আমার বুকের  ধড়াস বেড়ে গেলো । চিন্তায় আমার চোখ মুখ ভারী হয়ে আসতে লাগলো ।তারপর বললাম,

- থ্রেট দিছে? কি বলেছে?

- বলেছে, বেশি বাড় বাড়িস না যেন। তোর আফার মতো তোর অবস্থাও করে দিবো কিন্তু তোকে।

নাঈমার মুখে কথাটা শুনেই যেন আমি একটা ধাক্কা খেলাম। আতঙ্কের সাথে বললাম,

- আফার মত মানে? তারপর? তুমি কি বললে??

- আমি কিছু না বলেই ভয় পেয়ে ফেনটা কেটে দিলাম। তারপর আপনার কাছে কান্নাকাটি করছিলাম ফোন দিয়ে।

- কিন্তু তখন তো তুমি বললে তুমি নাকি আপুকে অনেক মিস করছো তাই। আর এই কথা কাল কেন বলোনি ? আজ কেন কান্না করলে ? আজ ও কি ফোন দিয়েছিলো নাকি?

- হ্যাঁ দিয়েছিলো কল কিন্তু আমি রিসিভ করিনি ।  তারপর তো আপনাকে আমি ফোন দিয়ে ডাকলাম । আমার খুব ভয় করছে। 

আমি অভয় দেওয়ার চেষ্টা করে বললাম,

- আরে ধুর কিছু হবে না তুমি এত ভয় পাও কেন । আমি এখনো বেঁচে আছি তো নাকি। তোমাকে সরল মেয়ে ভেবে  ভয় দেখিয়েছে হয়তো ।  পুলিশের কাছে নাম্বারটা দিলে  দিলে ওর চৌদ্দ গোষ্ঠী বের করে ছাড়বে পুলিশ আমাদের কিছুই করতে হবে না । 

 নিজের ভেতর একটা সন্দেহ  ঢুকে গেলো । এই কথা বলে কেন থ্রেড দিলে । "আফার মত অবস্থা করবে "এই কথাটাই বা কেন বললো ? তাহলে কি মাইশার খুনের পেছনে এই লেকের কোন লিঙ্ক আছে ?  নাঈমার ফোন নম্বরও বা কিভাবে পেলো।

নাঈমা বললো,

- কিন্তু দুলাভাই আপনি  কোন নম্বর দিবেন পুলিশ কে ? লোকটি তো এক এক সময়ে তো ভিন্ন-ভিন্ন নম্বর দিয়ে কল দিচ্ছে ।

- আচ্ছা নম্বর গুলা দাও আমাকে।

নম্বর গুলা লিখে রাখলাম । কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে হত্যার পেছনে এই ছেলের কেন না কোন হাত আছে।কিন্তু আবার অন্য প্রশ্ন চলে আসে । হত্যাই যদি করবে তবে গহনা চুরি কেন করলো তারা ? আলমারির চাবি তো থাকে মাইশার কাছে। ও লুকিয়ে রাখে চাবি। আর আলমারি তো দেখলাম চাবি দিয়েই খোলা। তাহলে নিশ্চয় কোন অস্ত্র দেখিয়ে চাবি নিয়ে গহনা নিয়েছে আর যাবার সময় রে'প করে গলা টিপে খুন করে গিয়েছে। মেডিকেল রিপোর্ট বলে, মাইশাকে একজন রে'প করে। ওরা সংখ্যায় কয়জন ছিলো? আর গহনা নিয়ে রে'প করলো এটা বুঝলাম কিন্তু খুন কেন করবে যদি অপরিচিত কেউ হয়ে থাকে ? 

তার মানে নিশ্চয় এমন কেউ এই কাজ করেছে যাদের মাইশা আগে থেকেই চিনে ।  পরবর্তীতে মাইশার হাতে ধরা খেয়ে যাওয়ার ভয়ে খুন করে গেছে যাতে কোন প্রমাণ না থাকে কারো কাছে। হ্যাঁ বাপারটা অনেকটা রহস্যের জট খুলে দিচ্ছে ।এই কাজ একার পক্ষে সম্ভব না। সাথে আরো লোক ছিলো। কিন্তু দারোয়ান তখন কি করছিলো?

ঘুরেফিরে প্রশ্ন এসে পড়ছে দারোয়ানের উপর। ডাকাতি করেছে রে*প করেছে খুন করেছে তারপর গ্রিল কেটেছে তাও আবার দিনের আলোতে আর দারোয়ান কিছুই জানে না তা কি হয় নাকি কখনো.. ? আমি নিশ্চিত যে হয়তোবা  দারোয়ান মাইশার খুনির  সাথে ছিলো নইলে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে খুনি  ওর মুখ বন্ধ রেখেছে। হয়তো দারোয়ানকে জানের ভয় দেখিয়েছে তাই সে কিছু বলতেছে না।  যদি জানের ভয় দেখিয়ে থাকে তবে দারোয়ান নিশ্চয় তাদের চিনে। এই তো আর একটা বিষয় ক্লিয়ার হয়ে গেলো। যে খুন করেছে সে পরিচিত কেউ। তাদের মাইশা ও চিনতো এবং দারোয়ান ও চিনে। 

নাঈমা হঠাৎ গা-এ ধাক্কা দিয়ে বললো,

- দুলাভাই.. ও দুলাভাই।

আমি সঙ্গা ফিরে পেয়ে বললাম,

- হ্যা বলো।

- কোন রাজ্যে আছেন আপনি? এতো ডাকছি কিছু শুনছেন না।

আমি দরজার দিকে তাকিয়ে বললাম,

- দরজাটা আগে খুলপ দাও। আম্মু দেখলে কি না কি বলে ।

নাঈমা তাচ্ছিল্যের স্বরে বললো যা পারে বলুক তো। সমস্যা নাই।

নাঈমা কথাটা এমন ভাবে বললো যেন ওর সাথে আমার বিয়ের পাকা কথা হয়ে গিয়েছে। এখন আর সমস্যা নাই।আমি অযুহাত দেখিয়ে উঠে বাইরে যেতে চাইলাম ঠিক তখনই নাঈমা আমার হাত টেনে ধরে বসিয়ে দিয়ে বললো,

- আরে আসছেন মাত্র একটু রেস্ট করেন তারপর কথা বলেন আমার সাথে সমস্যা নাই ।

এই মেয়ের ভাব গতি আমার কাছে ভালো ঠেকছে না আমার কাছে।যদিও আমাকে ওর আগে থেকেই পছন্দ  ।  আগে শুনতাম ওর আপু মানে মাইশার সাথে ফাজলামী করে বলতো মাঝে মাঝে,‘আপ্পি.. তোর জামাইয়ের প্রেমে পড়েছি রে আমি । দিয়ে দে না আমাকে।’ মাইশা খুনশুটির সুরটেনে বলতো, ‘শখ কত। আমার স্বপ্নীলের দিকে একদম চোখ তুলে তাকাবি না বলে দিচ্ছি।’

এটা নিয়ে কত মজা তামাশা করতো দুই বোন মিলে। আজো যেন চোখে ভাসে মাইশার সেই আগলে রাখা নিজের সবটা দিয়ে কিভাবে ভালোবাসতো আমাকে। আর বারবার বলতো ‘স্বপ্নীল,,, ? আমার নীল তুই কখনো আমাকে ছেড়ে যাবি না তো? তোকে ছাড়া যে আমি একটা সেকেন্ড বাঁচে থাকতে পারি না ।  আজ সেই তুমি আমাকে ছেড়ে ওই দূরের মিলিয়ে গেছো 😭। ছেড়ে গেলেতো তুমি । না তুমি যাওনি তোমাকে তো আমার কাছ থেকে কেঁড়ে নিয়েছে হায়নার দলেরা। ওদের ছাড়বো না আমি কখনে।

নাঈমাকে আমার শাশুড়ি মা ডাক দিলেন । ও আসি বলে চলে গেলো এখান থেকে । এরি মধ্যে ফোন বেজে উঠলো পকেট থেকে বের করে দেখি যে এস. আই. ফোন দিছে হয়তো কেন দরকারে।ফোন রিসিভ করলাম,

-  হ্যা অফিসার বলেন?

- শুনলাম আপনি শ্বশুর বাড়ি গিয়েছেন।

- হ্যাঁ। আসতে হলো একটু।

- এ সময় বেশি বাইরে না যাওয়ায় ভালো আপনার জন। যাইহোক, যে জন্য ফোন দিয়েছি সেটা বলপ নেই আগে ।

- আগে আমাকে এটা বলুন আমার আলমারি যে খোলা ছিলো সেটা কি আপনারা দেখেননি নাকি.. ?

- হ্যাঁ অবশ্যই দেখেছি। আপনার আলমারিতে তো তেমন কিছু দেখলাম না সন্দেহ জনক। কেন বলুন তো কি হয়েছে ?

- আচ্ছা বিস্তারিত পরে বলছি আমি । আগে আপনি কি জন্য ফোন দিলেন  সেটা বলেন ?

- ওহ হ্যাঁ। আপনার বাসার বেলকনির পাশে  পেছনের সাইটে আর কি। ওখানে  তিন বছরের একটা বাচ্চার লাশ পাওয়া গেছে।

কথাটা শুনেই যেন আমি আকাশ থেকে পড়লাম। আতঙ্কের স্বরে বললাম,

- কিহহহ..? কখন? কার বাচ্চা? কিভাবে হলো?

- এতো প্রশ্ন না করে আপনি চলে আসুন আপনার কাজ শেষ করে । সব জানতে পারবেন।আর হ্যা..কালকে দিনের মধ্যেই চলে আসেন সাবধানে থাকবেন আপনি ।

অফিসার ফোনটা রেখে দিলো।আমি স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম।কি হচ্ছে এসব? আবার আমার কোন ক্ষতি করবে না তো? আর কি চায় ওরা?

(৪)

আমার বাসার পাশেই ৩ বছরের বাচ্চার লাশ ? এই লাশ কোথা থেকে এলো?আমি যে বিল্ডিং এ থাকি সেখানে তো এমন কোন পরিবার নেই যাদের এতো ছোট বাচ্চা আছে। সবার সাথেই তো আমার পরিচয় আছে।এটা নিশ্চয় কেউ মেরে ফেলে দিয়ে গেছে। কিন্তু এত্ত ছোট বাচ্চাকে  পাঁচিল টপকে আমার বাসার পাশে মেরে ফেলে দিয়ে গেলো.. ? শহরে তো আরো কত  জাগয়া আছে যেখানে লুকানোর মতো সেখানে ফেলতে পারতো। কিন্তু সেটা না করে এই বাচ্চা ফেলার পেছনে কারণ কোন একটা  অবশ্যই আছে । আর সেটা যদি আমি হই,  এসব ভাবতে ভাবতে আমার বলা সুখই আসছিল। 

বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন জানি ভয় লাগতে শুরু করলো । তিন বছরের খুন করা বাচ্চা ফেলে আমাকে তার্গেট করছে সেটা বোঝাতে চাচ্ছে না তো  আবার ? আমার গলা শুকিয়ে গেলো।নাঈমা কে ডাক দিয়ে বললাম, এক গ্লাস পানি দিয়ে যেতে।মাইশাকে খুন করার পর কি ওরা আমাকে মারতে চায়? কিন্তু আমাকে মেরে কার কি লাভ? আমার তো কারো সাথে শত্রুতা নেই।

এরিমধ্যে নাঈমা  কিছু বিস্কিটস আর এক গ্লাস পানি নিয়ে হাজির আমার সামনে । পানির গ্লাসটা আগে নিতে গিয়ে দেখি নাঈমার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি বেশ খুশিখুশি ভাব ওর চেহারায় । আমি প্রায় এক নিশ্বাসে গ্লাসের সব পানি খেয়ে নিলাম।বিষয়টা নাঈমা বেশ কৌতুহলের সাথে দেখলো এবং আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।

আমি বললাম,

- কি ব্যাপার সামনে দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো?

নাঈমা মিষ্টি গলায় বললো,

- না দুলাভাই। আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ভালোলাগছে।

- তাহলে সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকো আমার সামনে। পারবে?

একটু রসিকতা করে বললাম। ওর মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে তুললাম।

নাঈমা বললো,

- আপনি বললে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো।

নাঈমার বলার ভঙ্গী দেখে মনেহলো ও বিষয়টা সিরিয়াসলি নিয়েছে।আমি স্বাভাবিক স্বরে বললাম,

- হ্যাঁ হইছে। দাঁড়িয়ে থেকে এই বুইড়ার থোবড়া দেখতে হবে না।

আমি খেয়াল করলাম নাঈমা হেসে দিলো। ওর সাজানো দাঁত বেরকরে মুখটা বাকিয়ে হাসিটা আমার খুব ভালো লাগে  নাঈমা তার হাসি থামিয়ে বলতে লাগলো।  

-  দুলাভাই আপনি কখনই কি বলেন । এই তো কয়দিন হলো আপনি আমার আপুকে বিয়ে করলেন,  আর এখন নিজেকে বুইড়া ভাবা শুরু করলেন ।

হঠাৎ দরজা ঠেলে রুমে শ্বশুর মশাই ঢুকলেন।আমি দেখেই সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম।

নাঈমা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো তাই দেখতে পায়নি হয়তে। ঘাড় ঘুরিয়ে বাবা কে দেখার সাথে সাথেই ওর মুখের হাসি ভাবটা কেটে স্বাভাবিক হয়ে গেলো। ওর হাতে ধরে রাখা বিস্কিটের পিরিচ টা পাশের টি-টেবিলের উপর রেখে রুম থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলো।

বাবাকে ভয়পায় খুব নাঈমা । শ্বশুর মশাই অবশ্য ভয় পাবারই মতো মানুষ সে বেশ গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ । 

সালামের উত্তর দিয়ে উনি আমাকে বসতে বললেন আমি উনার দিকে তাকিয়ে থাজলাম । রুমে রাখা সোফাতে উনি বসার পর আমি নিজেও বসলাম। উনি শহরের বড় একজন ব্যবসায়ী। বেশ টাকাপয়সা করে ফেলেছেন ব্যবসা করে । আমি নেহাত বিশ্ববিদ্যালয় লাইফ শেষ করেই মুটামুটি ভালো একটা চাকরী পেয়েছিলাম বিধায় উনার মেয়েকে অনেক ইতস্ততের পর আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।মাইশা যাওয়ার পর মানুষটা আরো বেশি গম্ভীর হয়ে গেছেন। খাওয়াদাওয়া ও নাকি ঠিকমতো করেন না। শাশুড়ি মা-র মুখ থেকে শুনলাম।

শ্বশুর মশাই গম্ভীর গলায় বললেন,

- চেহারার কি হাল বানিয়েছো?

উনার মুখে প্রথমে কথাগুলো শুনে আমি কিছুক্ষণের জন্য অবাক হয়ে রইলাম  । কি উত্তর দিবো আমার মাথায় তখন কিছুই আসছিল না আমি উত্তর খুজে না পেয়ে বললাম, 

- না.. মানে..  ঘুমের একটু অসুবিধে ছাড়া আমার আর তেমন কোন কিছুই হচ্ছে না  ...

উনি এক দৃষ্টিতে আমার বড় বড় চোখ  দিকে তাকিয়ে আছেন। হয়ত ভাবছেন, আমার মেয়েটাকে অনেক বেশি ভালোবাসে ছেলেটা।  ওকে হারিয়ে নিজের কি যে একটা অবস্থা করে রেখেছে সে দিকে খেয়াল নাই।

উনি একটু নরম গলায় বললেন,

- তা. কয়টা দিন থেকে যাও সুস্থ হয়ে তারপর বাসায় যেও। তোমাকে দপখতে পেলে আমাদের ও একটু ভালো লাগে । মাইশা হারিয়ে গেছে বলে আমাদের পর করে দিও না যেন তুমি । যখনি সময় হবে এই বুড়ো-বুড়ি দুইটাকে দেখে যেয়ো এসে। এই অনুরোধ টুকু রেখো।

এক দমেই যেন কথা গুলা বলে ফেললেন তিনি আমি বিনীত ভাবে বললাম,

- জি আব্বু। এভাবে কেন বলছেন আপনি । আমি তো আপনাদের ছেলে তাই না ছেলে হয়ে বাবা মা কে দেখতে আসবো না এটা হয় নাকি ?৷ মন চাইলেই আপনাদের কাছে ছুটে আসবো ।

শ্বশুর মশাই সোফা থেকে উঠিতে-উঠতে বললেন,

- আচ্ছা বাবা তুমি রেস্ট করো তাহলে। আমি যাই দেখি মিলাদের আয়োজন করি।

এই বলে উনি চলে গেলেন এখান থেকে । আমার মনটা ভারী হয়ে গেলো কেন যানি ।  এই বাড়ির আনাচেকানাচে সকল স্থানে যেন মাইশা কে দেখতে পাই আমি। মনে হয় এই যেন মাইশা আমার সামনে থেকে চলে গেলো। এই বুঝি নাঈমার সাথে খুনশুটি শুরু করে দিলো।আমার দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে।

দেখলাম নাঈমা খারাপ করে তার রুমে চলে গেল ।আমি বললাম,

- কি ব্যাপার? আকাশে এতো মেঘ কেন?

দেখলাম নাঈমা দরজা বন্ধ করে দিলো।দরজা লক করে আমার দিকে ফিরতেই দেখি ওর চোখে পানি চলে আসছে।আমি মুখে ভঙ্গী ফুটিয়ে তুলে বললাম,

- কি হয়েছে নাঈমা? কাঁদছো কেন? একটু আগেই তো ভালো ছিলে?

নাঈমা কোন কথা না বলে সোজা আমার পা জড়িয়ে ধরে বসে থাকলো ।

চলবে.......

5 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন