#গল্পঃ #মাইশা_মৃত্যু #শেষ_পর্ব_০৫ (সমাপ্ত)





 #গল্পঃ #মাইশা_মৃত্যু 

#শেষ_পর্ব_০৫ (সমাপ্ত)

--------------------------------

নাঈমার কাছ থেকে নেওয়া নম্বর আর অফিসারের কাছ থেকে নেওয়া নম্বরের মধ্যে তিনটা নম্বর মিল থাকাটা যেন আমার কাছে অলৌকিকতার মত লাগলো। নিজের ভেতর উত্তেজনা বেড়ে গেলো। তার মানে দারোয়ানকে যে কল দেয় আর নাঈমাকে যে কল দিয়েছিলো সেটা একই ব্যক্তি?

নাঈমার দেওয়া নম্বরের কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম সেখানে চারটা নম্বর লেখা। তার মধ্যে থেকে উপরের দুইটা আর নিচেরটা এই তিনটা নম্বরের মিল।কিন্তু.. আর একটা নম্বর?? এই নম্বরটা তো অমিল।অমিল নম্বরটা কলম দিয়ে একটা টিক চিহ্ন দিয়ে রাখলাম।আর একটা কাগজের টুকরায় নম্বরটা টুকে নিয়ে কাগজটা মানিব্যাগে ঢুকিয়ে রাখলাম।

প্রচন্ড গরম অনুভূত হচ্ছে।কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমা হয়েছে আর সেই সাথে উত্তেজনার শিখরে। কেন জানি মনে হতে লাগলো নাঈমার দেওয়া এই অমিল নম্বরটাই হয়ত সকল রহস্যের সমাধান এনে দিবে।

আচ্ছা? অফিসারের দেওয়া নম্বর গুলা তো উনি ট্রাকিং এ রেখেছেন।এখনো অবধি তো সেই নম্বর গুলো ওপেন হলো না।এই অমিল নম্বরটা ও ট্রাকিং এ রাখতে হবে।মাত্র তো থানা থেকে আসলাম। আবার থানায় যাবো?আগে অফিসারকে ফোন দেওয়া দরকার। উনি আবার বাইরে বের হয়েছেন কি না।

ফোন দিয়ে শুনলাম উনি থানাতেই আছেন।আমি আবারো তাড়াহুড়ো করে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

.

জেলখানা হয়ে আসার সময় দেখলাম দারোয়ান দুই দেওয়ালের জয়েনিং এর মাঝে হেলান দিয়ে মাথাটা দেওয়ালে ঠেকিয়ে সিলিঙের দিকে চেয়ে বসে আছে। হয়ত ভাবছে, আমার কি দোষ? গরীব হওয়াটাই কি আমার দোষ? আজ টাকার অভাবে পড়ে লোকের বাসায় দারোয়ানের চাকরী নিতে হয়েছে।আর এই টাকার জন্যই আজ আমি এখানে।হয়ত জীবনের প্রতি চরম ঘৃণা দু চোখ দিয়ে ছুঁড়ে মারছে জেলখানার সিলিং এ।

আমি আর দাঁড়ালাম না।অফিসারের রুমের দরজার সামনে আসতেই অফিসারের চোখে চোখ পড়লো। উনি অনেকটা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। কেসের আসামী এখনো ধরতে না পারায় উপরমহলের চাপ খেয়ে হয়তো উনার এই অবস্থা।

উনার কষ্টের আগুনে পানি ঢেলে বললাম,

- অফিসার? কেসটা হয়তো সলভ হতে যাচ্ছে।

উনি আমার দিকে ফিরে কথাটা এমন ভাবে শুনলেন যেন আমার দিকে উনার কোন মনোযোগ নেই।বেশ শান্ত গলায় অফিসার বললেন,

- কি ব্যাপার স্বপ্নীল সাহেব দাঁড়িয়ে কেন? বসার কথা কি বলা লাগবে? 

আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বেরকরতে করতে বললাম,

- বসতে আসিনি অফিসার।একটা কাজে এসেছি।

- বলুন কি করতে পারি আপনার জন্য?

আমি মানিব্যাগ থেকে সেই অমিল নম্বরের কাগজের টুকরাটা উনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম, 

- এই নম্বরটা একটু ট্রাকিং রাখতে হবে অফিসার।

অফিসার ভ্রুকুচকে বেশ কৌতুহলের সাথে কাগজটার দিকে তাকালেন। বললেন,

- কিসের নম্বর এটা?

আমি কণ্ঠে ভরসা ভাব ফুটিয়ে তুলে বললাম,

- এই কেসের রহস্যের নতুন একটা দ্বার উন্মোচিত হতে পারে এই নম্বর দিয়ে অফিসার।

অফিসার আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন যেন উনার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।আমি বিষয়টা ক্লিয়ার করার জন্য বললাম,

- আপনাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম অফিসার।আমার শ্যালিকা নাঈমার ফোনে একজন বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন করে আলাপ জমাতে চায়।একপর্যায়ে নাঈমা রিএক্ট করলে তাকে থ্রেড দেয় এই বলে যে, ‘তোয়ার বড় আপুর মত কিন্তু রেপ করে খুন করবো ’।আমি সেদিন শ্বশুর বাড়ি গেছিলাম মূলত এই কারণে।

অফিসার কপালে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন,

- কিন্তু সে তো এমন কেউ হতে পারে যে ওর আপুর মৃত্যু কিভাবে হয়েছে সেটা জনে। তাই সেটা বলে ভয় দেখাচ্ছে। এটার সাথে এই কেস সলভ হওয়ার মধ্যে কি সম্পর্ক?

- সম্পর্ক আছে অফিসার। তারজন্যই তো আবার থানায় আসতে হলো

এই বলে সামনের চেয়ারের পেছনের অংশে দুইহাত দিয়ে চেপে শরীরের কিছুটা ভর দিলাম।

এটা অফিসার লক্ষ্য করে বললেন,

- আপনি কি বসবেন না বলে বাসা থেকে শপথ  করে আসছেন নাকি  ? বসুন বসুন সমস্যা নাই । আমি চা দিতে বলি ।

এই বলে উনি দুকাপ চা আনতে বললেন।আমি বসলাম।

অফিসার দুইহাত টেবিলের উপর রেখে বললেন,

- হ্যা বলুন। তারপর?

আমি অনেকটা শান্ত গলায় বলা শুরু করলাম,

- আমি শ্বশুর বাড়ি গিয়ে শ্যালিকার কাছ থেকে ওকে যে কল করে থ্রেড দিয়েছে তার নম্বর নিয়ে এসেছিলাম আপনার কাছে দিয়ে ট্রাকিং এ দিব বলে। কিন্তু আমার খেয়ালে ছিলো না।

এরই মধ্যে চা হাজির। অফিসার চা-এর কাপটা হাতে নিয়ে বললেন বললেন,

- তারপর? 

- তারপর আমি আপনার কাছ থেকে যে তিনটা নম্বর নিয়েগেছিলাম না?সেই তিনটা নম্বরের সাথে আমার শ্যালিকার দেওয়া নম্বর মিলে যায়।

অফিসার চা-এ চুমুক দিতে যাবে এমন সময় আমার এই কথা শুনে কাপ নামিয়ে চোখ বড়বড় করে বললেন,

- কি?.. আপনি ভালোভাবে মিলিয়ে দেখছেন তো? কই দেখি আমি? 

আমি কাগজ দুইটা উনার সামনে মেলে ধরলাম। উনি মিলিয়ে দেখছেন আর তার উত্তেজনা যেন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একটা নম্বরে উনার ডান হাতের আঙুলের নিছে রেখে বললেন,

- এই ফোন নাম্বরটা তো মিলে না স্বপ্নীল সাহেব।

- ওই ফোন নাম্বরটা নিয়েই তো আপনার কাছে হাজির অফিসার।

অফিসার সাথে-সাথে উঠে দাঁড়িয়ে কাগজ গুলো হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বললেন,

- একটু বসেন আমি এখনি আসছি।

কিছুক্ষণ পরে এসে উনার চেয়ারে আরাম করে বসে বললেন,

- নম্বরটা ট্রাকিং এ রেখেছি। দেখা যাক কোন রেসপন্স পাই কি না। 

আমি অফিসারের দিকে ঝুকে বললাম,

- আমি নিশ্চিত অফিসার।এটাই সেই খুনী।

.

.

দুইদিন হয়ে গেলো কিন্তু থানা থেকে কোন খবর পেলাম না। ওদিকে দারোয়ান জেলে বন্দী। এতো টর্চার করে ও মুখ খুলাতে পারছে না।মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ডাইনিং টেবিলের উপর দুইহাত ভাজ করে তার উপর মাথা রেখে আমার মাইশার সাথে কতরকম স্মৃতি মনে করছিলাম। ঠোঁটে লবণাক্ত স্বাদ পেলাম। খেয়াল করে দেখলাম চোখের জল মুখ গড়িয়ে ঠোঁটের উপর এসে পড়ছে। হাতের উল্টাপিঠ দিয়ে পানি মুছে দিলাম। 

হঠাৎ কলিংবেল বেজে ঊঠলো।কে এলো এই দুপুরে? 

বেসিনে গিয়ে মুখটা ধুয়ে এসে দরজা খুলতেই অবাক আমি।নাঈমা আর আমার শাশুড়ি মা হাজির।নাঈমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ঈদের চাঁদ দেখছে।

হাস্যজ্বল মুখে বললো,

- কেমন আছেন দুলাভাই? 

আমি মাথা ঘুরিয়ে শাশুড়ির  দিকে তাকিয়ে বললাম,

- কেমন আছেন আম্মু? আসেন ভেতরে আসেন প্লিজ।

উনাদের ভেতরে পাঠিয়ে আমি উনাদের ব্যাগ নিয়ে পেছন পেছন এলাম।শাশু-মা ভেতরে ঢুকে চারিদিকে দৃষ্টি দিলেন। উনার দিকে তাকিয়ে দেখি উনার চোখে পানি। 

উনি কাঁদতে-কাঁদতে ভাঙা গলায় বললেন,

- আমি দেখতে পাচ্ছি আমার মাইশা,যেন আমার চোখের সামনে ঘুরছে।

উনার কথা শুনেই আমার চোখে পানি চলে এলো। এই বাসার সকল জিনিসে যেন মাইশা মিশে আছে। বাসাটা আজ খাঁ খাঁ করছে। সাহারার মরুভূমির মাঝে যেন আমি এক পথহারা আগন্তুক। জীবনের সবকিছু আজ ধোঁয়াশা হয়ে গেলো।

একটা দীর্ঘস্বাস ফেলে উনাকে শান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। সোফায় উনাকে বসিয়ে নাঈমা কে বসতে বলবো কিন্তু ও এখানে নেই। কোথায় গেলো মেয়েটা। উনাদের জন্য নাস্তা রেডি করতে রান্নাঘরে গিয়ে দেখি নাঈমা এখানে। ও নাস্তা বানাচ্ছে।

আমি ভেতরে না ঢুকে দরজার দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি। সংসার গোছানোর দায়িত্বপূর্ণ ক্ষমতাটা যেন সৃষ্টিকর্তা নারীদের মাঝে নিজ হাতে দিয়েছেন।অগোছালো রান্নাঘরটা মুহুর্তেই গুছিয়ে ফেললো নাঈমা।

পিছু ফিরতেই দেখে, আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে।ও আমাকে দেখে একটু লজ্জা পেল।একটু মুচকি হাসি দিয়ে সামনে ফিরে আবার নিজের কাজ করতে লাগলো।

আমি ধীরেধীরে পাশে গিয়ে আলতো গলায় বললাম,

- তোমার আপুকে হারানোর পর থেকে আমার সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে। 

নাঈমা নাস্তা ট্রেতে রেডি করতে করতে বললো,

- আপুর রেখে যাওয়া সংসার এখন না হয় আমি গুছিয়ে নিলাম।

নাঈমার কথার মাঝের অব্যক্ত কথা আমি বুঝে ফেল্লাম।ও কি চায় আজ যেন পরিষ্কার। কিন্তু এটা সম্ভব না। নিজের সব কিছু যে আমি মাইশা কে দিয়েছি সেই আমি কিভাবে অন্যজনকে দিবো? নাঈমার কথার উত্তরে কি বলবো আমি অনেক ভেবে ও খুঁজে পেলাম না।

আচমকা নাঈমা ঘুরে আমার একেবারে কাছে চলে এলো। আমি ঘাবড়ে গেলাম। 

নাঈমা আমার চোখে চোখ রেখে বললো,

- কি? দিবে আমাকে? নতুন করে সংসারটা সাজাতে?

নাঈমাকে দেখে মনে হচ্ছে এই আমার মাইশা। আমার মাইশা যেন ওর মাঝে ভর করেছে। দুই বোনের মাঝে কি মিল।আমাকে যেন হ্যালোসিনেট করে ফেলেছে নাঈমা। আমি ইতস্তত করে কছু বলতে যাবো তখনই পা-এর শব্দ পেলাম। সাথে-সাথে আমি দূরে সরে গেলাম।

একটু বাদেই শাশুড়ি মা প্রবেশ করলেন। উনার দুচোখ কান্নাজল মাখা। লাল হয়ে উঠেছে।

আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। 

শাশু-মা কে বললাম,

- আপনি আবার কষ্টকরে রান্নাঘরে এলেন কেন। অনেক জার্নি করেছেন একটু রেস্ট করেন। নাস্তা রেডি করেছে নাঈমা।

শাশু-মা নাঈমার কথা শুনে বেশ অবাক হলেন।যে মেয়ে বাসায় এক গ্লাস পানি ঢেলে খায় না। সে জার্নি করে এসেই নাস্তা রেডি করে ফেলেছে?আমি বুঝতে পারলাম উনার অবাক হওয়ার কারণ।

মেয়েরা যখন কোন কিছু মন থেকে চায় তখন সেটার জন্য নিজের সর্বোচ্চ বিলিয়ে দিতেও দ্বিধা করে না। 

নাঈমাকে দেখলেই সেটা বোঝা যাচ্ছে।

হঠাৎ আমার ফোন বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখি অফিসারের নম্বর।

আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং রুমে আসলাম।ফোন রিসিভ করে উত্তেজনার সাথে বললাম,

- হ্যাঁ অফিসার বলেন?

- একটা ভালো খবর আছে?

কথাটা শুনেই আমার হৃদস্পন্দন আরো বেড়ে গেলো।শুকনা ঢোক গিলে বললাম,

- কি ভালো খবর অফিসার?

- আপনার দেওয়া নম্বরটা থেকে সেই অমিল নম্বরটাই রেসপন্স করেছে।আমরা ট্রাকিং করে স্থান-ঠিকানা সব নিয়ে ফেলেছি।আপনি দ্রুত থানায় আসেন।একসাথেই যাবো।

আমি ফোন রেখে। দ্রুত পা-এ রান্নাঘরে গিয়ে বললাম,

- মাইশার খুনের আসামীর সন্ধান মিলেছে। আমাকে এখনই থানায় যেতে হবে। আপনারা রেস্ট করেন আমি কাজ মিটিয়ে দ্রুত আসছি।

এই বলেই এক মুহুর্ত দেরী না করে যে পোশাকে ছিলাম সেই পোশাকেই পাগলের মত ছুটে গেলাম।একটা অটো নিয়ে থানায় গিয়ে দেখি অফিসার গাড়িতে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।

আমি দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লাম। ঠিকানা অনুযায়ী গাড়ি যেতে লাগল।এখন পুলিশ ল্যাপটপ নিয়ে নাম্বারটার অবস্থান ফলো করে যাচ্ছেন।আমার বুকের ধড়পড়ানি ক্রমশ পাড়ছে। প্রত্যেকটা হৃদস্পন্দন আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি।

শহরের প্রায় পাশে এসে একটা গলীর সামনে গাড়ি থামলো। এই গলী দিয়ে গাড়ি ঢুকতে পারবে না। আমাদের গাড়ির পেছনে আর একটা পুলিশের গাড়ি। বেশ ১০-১৫ জনের মত কনস্টেবল এসেছে। অফিসারের নির্দেশে সবাই সবার অবস্থান নিয়ে নিলো।

খুব দ্রুত যেতে হবে। সিমটা অফ করলেই এই গলীর মাঝে সব হারিয়ে যাবে।বেশ কিছুদূর যেয়ে একটা বিল্ডিং এর সামনে এসে দাঁড়াতে বললেন অফিসার। উনি আছেন সাধান পোশাকে। এই বিল্ডিং হতেই সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে। অফিসার সব কনস্টেবলদের বাড়ির চারপাশ ঘেরাও করতে বললেন। 

আমি, অফিসার সাকিব আর চারজন কন্সটেবল বিল্ডিং এর সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছি। একজন ল্যাপটপ ধরে আছে। সিগন্যাল থেকে আমরা ৫-৬ মিটার দূরে। তিনতলায় উঠেই দেখি সিগন্যাল একদম নিকটে। তিনতলায় দুইটা অ্যপার্টমেন্ট। একটাতে তালা ঝুলছে। আর একটা খোলা। ব্যাপারটা আরো সহজ হয়ে গেলো। কনস্টেবলদের একটু গা-ঢাকা দিতে বললেন অফিসার।

সাধারণ পোশাকে আমি আর অফিসার। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কলিংবেলের সুইচ চাপলাম। কয়েকবার চাপলাম। সবাই সবার পজিশনে রেডি। অফিসার তার হ্যান্ডগানে হাত দিয়ে আছেন। দরজা খোলার শব্দ পেলাম। দরজা খুলতেই যাকে দেখলাম তাতে আমি আর অফিসার যেন ২২০ ভোল্টের ধাক্কা খেলাম।

আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা।এটা কিভাবে সম্ভব? কাদের ভাই??কাদের ভাই আমাদের দেখে ভিমড়ী খেলেন। সাথে-সাথে দুইজন কনস্টেবল কাদের ভাইয়ের দিকে রাইফেল তাক করলো। আর একজন কনস্টেবল ভেতরে গিয়ে কাদের ভাইয়ের হাতে হ্যান্ডকার্ফ পরিয়ে দিলো।

কাদের ভাই বিষ্ময়ের সাথে বললেন,

- কি ব্যাপার কি হচ্ছে এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

অফিসারের মুখে সেই পৈশাচিক হাসি। অফিসার তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন,

- সবই বুঝতে পারবেন কাদের সাহেব। খুব ঘুরিয়েছেন আমাদের। এতোদিনের ঘুম হারাম করে দিয়েছেন।

ল্যাপ্টপ হাতে অন্য একজন কনস্টেবল ভেতরে ঢুকেই দেখে সিগন্যাল থেকে হাফমিটার দূরে।

কাদের ভাবী ঘর থেকে বাইরে এসেই চমকে গেলেন। 

ভাবী চিল্লিয়ে বললো,

- এসব কি? আপনারা ওকে ধরছেন কেন?

অফিসার বললেন,

- কেন ধরছি তা একটু পরেই টের পাবেন।

এই বলে অফিসার সেই নম্বরটা কাদের ভাবীকে দেখিয়ে বললেন,

- দেখুন তো এই নম্বর চিনতে পারেন কি না? 

ভাবী মনোযোগ দিয়ে দেখে বললো,

- হ্যাঁ। এই সিমটা ওয়ারড্রবে পড়ে থাকতে দেখে আজই অন করলাম।

ভাবীর মুখে এই কথা শুনেই কাদের ভাই ভাবীর দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন।

ভাবী বললেন,

- কেন? এই নম্বরে কি?

অফিসার আবার একটা পৈশাচিক হাসি হেসে বললেন,

- আপনি কি জানেন আপনার স্বামী একজন খুনী?একজন ধর্ষক, 

অফিসারের মুখে নিজের স্বামীর নামে এসব শুনে। রেগে গিয়ে ভাবী বললেন,

- কি সব উল্টাপাল্টা বলছেন আপনি?

ওদিকে কনস্টেবল ঘরথেকে ফোনটা নিয়ে এসে বললো,

- স্যার? এতেই সেই সিম।

অফিসার এবার ভাবীকে বললেন,

- এখন আমাদের থানায় যেতে হবে বিস্তারিত থানায় এসে শুনে যাবেন।

.

.

কাদের ভাইকে পিঠমুড়িয়ে চেয়ারের সাথে বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। এদিকে নাঈমা ফোন দিয়েই যাচ্ছে। আমি এখন থানায়। একটু সাইডে এসে ফোন রিসিভ করতেই,নাঈমা উত্তেজিত হয়ে বললো,

- কি ব্যাপার? এত্তবার ফোন নিচ্ছি দেখো না?কোথায় তুমি? খুনীকে কি ধরা গেছে?

নাঈমার বলার ভঙ্গী দেখে মনেহলো আমি ওর হাসব্যন্ড। কিছু না হতেই মেয়েটা যেন সব অধিকার নিয়ে বসে আছে।

আমি বললাম,

- খুনী ধরা হয়েছে। জিজ্ঞাবাদ করা হচ্ছে। ব্যস্ত আছি ফোন রাখো।

এই বলে কেটে দিলাম।

জেলের ভেতর জিজ্ঞাবাদের ওখানে যেয়ে দেখি কাদের ভাইয়ের মুখে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ পড়ে আছে। মাত্রই হয়তো অফিসারের সটান হাতের থাপ্পড় খেয়েছে। কাদের ভাইয়ের গোলগাল মুখে তা ভালোই লেগেছে মনে হচ্ছে।

দেখলাম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবল এক মোটা তেলমাখানো লাঠি দিয়ে কাদের ভাইয়ের ডান বাহুতে সজোরে বাড়ি কষলো।

কাদের ভাই চিৎকার দিয়ে উঠে বললো,

- আমি বলছি। এখন লুকিয়ে আর কি হবে। মারতে নিষেধ করেন প্লিজ।

অফিসার রক্তচক্ষু নিয়ে বললেন,

- হ্যা বল। আবার দারোয়ানের মত বানিয়ে গল্প বলিসনা। একটা হাড় কিন্তু আস্ত রাখবো না।

আমি অফিসারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। শান্তস্ব ভাবের মানুষটার এরুপ বাঘ হয়ে যাওয়া দেখছি।

কাদের ভাই বলা শুরু করলেন,

-আসলে আমি ভাবীকে মারতে চাইনি ...। আমি গহনা গুলো লুট করতে চেয়েছিলাম.....। আমার সাথে দারোয়ান আর একজন ছিলো.।  আমি ভাবীর গলায় ছুরি ধরে আলমারির চাবি নেই । গহনা নেওয়ার সময় ভাবী চিল্লাচিল্লি করছিলো তাই দারোয়ান মুখ চেপে ধরে। আর রেপ দারোয়ানই করে।

এই শুনে আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো। ইচ্ছে করলো দারোয়ানকে খুন করে আসি।

অফিসার কড়া গলায় বললেন,

- তাহলে খুন করলো কে??

- রে'প করার সময় গলা মুখ একসাথে চেপে ধরাতেই দম আটকে মারা যায়।

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। কনস্টেবলের হাত থেকে লাঠি টা নিয়ে পাশে বসিয়ে রাখা দারোয়ানকে ইচ্ছা মত পিটানো শুরু করলাম। অফিসার প্রথমে কিছু বললেন না। এক পর্যায়ে আমাকে থামতে বললেন। আমি উনার কথা শুনলাম না। আজ মেরেই ফেলবো একে। দুই কনস্টেবল আমাকে সরিয়ে নিয়ে লাঠি নিয়ে নিলো। ওই রাগে রাগে কাদের ভাইয়ের মুখে চার-পাঁচটা থাপ্পড় দিলাম। 

এ পর্যায়ে অফিসার কাধে হাত রেখে বললেন,

- শান্ত হন স্বপ্নীল ভাই। আমি আপনার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। কিন্তু এটা থানা। 

আমি উনার কথায় সরে এসে বাইরে তাকাতেই দেখি নাঈমা আর আমার শাশু-মা দাঁড়িয়ে দেখিছিলো।দেখলাম দুজনের চোখেই পানি।

অফিসার আবার প্রশ্ন করলেন কারেন ভাইকে,

- আর বল.. বেলকনির গ্রিল কাটলো কে?

- গ্রিল আসলে অনেক আগে কেটে রাখা। স্বপ্নীল ভাই আর ভাবী বেড়াতে গেলে তখন কাটা।

- তো গ্রিল কেন কাটলি? 

- গ্রিল কাটছিলাম কারণ, প্রথমে ভেবেছিলাম যে এই গ্রিল কেটে তারপর জানালার গ্রিল কেটে চুরি করবো। প্রথম দিনে বাইরের গ্রিল কাটি আর দ্বিতীয় দিনে উনারা বাসায় ফিরে আসেন বলে আর হয়নি।

- আর ওই ৩ বছরের বাচ্চার লাশ কেন ফেললি?

- ওটা আসলে স্বপ্নীল ভাইকে ফাঁসানোর জন্য আর এই কেস যেন কোন সমাধানে না আসে তাই।

অফিসার কাদের ভাইয়ের মুখোমুখি যেয়ে বললেন,

- বাহ.. ভালোই চাল চেলেছিস দেখছি।

আমি কাদের ভাইয়ের চুলের মুঠি ধরে বললাম,

- আমার শ্যালিকার নম্বর কোথায় পেলি??

কাদের ভাই আতঙ্কের সাথে বললেন,

- ভাবীর মোবাইল থেকে।

শোনা মাত্রই আরো দুইটা থাপ্পড় বসালাম।আবার জিজ্ঞেস করলাম,

- আমার ঘরে যে দুই সেট গহনা আছে তুই কিভাবে জানলি?

- আমার ওয়াইফ ভাবীর কাছ থেকে একটা অনুষ্ঠানে যাবার জন্য একটা নেকলেস চেয়ে নেয়। ভাবীই আমার ওয়াইফের সাথে গল্প করে। আর সেই সুবাদেই জানতে পারি।

আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। দুই দিন প্রায় না খেয়ে আর এতো উত্তেজনায় আমার মাথা ঘুরে চোখে ঝাসা দেখা শুরু করলাম।

.

.

আমার জ্ঞান ফিরতেই দেখি নাঈমা আমার মাথায় পানি ঢালছে।আমি একটু চেয়ে আবার চোখ বন্ধ করলাম।

একদিন পরেই সুস্থ হয়ে উঠলাম।

বিষয়টা আমি পরে জানতে পারলাম, কাদের ভাই,আমার বাসার ধারণ  সহ আরো কয়েকজন লোককে করে চালান করে দিয়েছে। 

অফিসার সাকিব আমাকে দেখে গেলেন। বন্ধুত্ব শুরু হলো উনার সাথে।আর এদিকে নাঈমা আমার পিছে পড়েই আছে...

(সমাপ্ত)

6 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন