≈ গল্পঃ আমাদের সংসার ≈ পর্ব - [ ০২ ]




 ≈ গল্পঃ আমাদের সংসার ≈

পর্ব - [ ০২ ]


---------------------------------

ওয়াশ রুম থেকে বের হয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে ডাটা অন করতেই দেখি দিয়ার ম্যাসেজ।বিছানায় শুয়ে শুয়ে দিয়ার সাথে চ্যাটিং করছি। এমন সময় নীরা এসে বললো, নাস্তা রেডি করেছি খাবেন চলেন। আমি কোন কথা না বলে আবার চ্যাটিং এ মনোযোগ দিলাম। নীরা কিছু সময় পর ফিরে এসে আবারও একই কথা বললো, মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল।

আমি খাট থেকে নেমে না খেয়েই বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বাসা থেকে বের হবার সময় নীরা আমাকে পেছন থেকে একবার ডাক দিলেও আমার রাগান্বিত চোখ দেখে আর কিছুই বলেনি। আমি সোজা দোকানে চলে গেলাম  যেয়ে চায়ের অর্ডার সাথে একটা সিগারেট জ্বালালাম।

দিয়াকে ম্যাসেজ দিলাম, আজ একসাথে লাঞ্চ করতে আসতে পারবে কিনা। দিয়া বললো আসবে, আমি দোকান থেকে চা সিগারেট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম দিয়ার সাথে দেখা করার জন্য। অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করছি, আমি দিয়াকে কয়েকবার ম্যাসেঞ্জারে নক করেছি, সে শুধু বলে অপেক্ষা করো আমি আসতেছি কিছুক্ষণের মধ্যেই  আসছি।

অনেক সময় অপেক্ষার পর দিয়া আসলো, আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 

- 'এতো দেরি হলো যে, '

দিয়া ভ্রুকুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, 

- 'তুমি কি আমাকে দেখে বুঝতে পারছো না কতটা সাজগোজ করেছি তোমার সাথে দেখা করতে আসার জন্য? বাসা থেকে রেডি হয়ে বের হয়ে পার্লারে দিকে গেছি,  তারপর তোমার সাথে দেখা করতে আসছি, আর তুমি আমাকে এটা এভাবে প্রশ্ন করতে পারলে?'

আমি দিয়াকে বললাম, 

- 'এসবের কি দরকার তুমি তো এমনিতেই সুন্দর ।'

দিয়া রেগে উঠে বললো, 

- 'তুমি আমাকে রূপচর্চা করতে নিষেধ করতেছ,  তুমি তো ভালো করে জান আমি ত্বকের কতটা যত্ন নেই 

আমি আর কিছু বললাম না। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো নীরা মেকাপ বিহীন মুখটা, যে মুখে একটা মায়াবী ভাব আছে। 

দিয়া বলে উঠলো, 

- 'এই কি হলো চুপ করে আছো কেন?'

আমি নিজেকে সামলে নিয়ে, 

- 'কই নাতো' 

দিয়া বললো, 

- 'চলো ক্ষুদা লেগেছে' 

তারপর দুজনে রেস্টুরেন্টে চলে গেলাম, খাবার অর্ডার করার কিছু সময় পর খাবার দিয়ে গেল। আমি খাচ্ছি আর দিয়াকে বার বার করে দেখছি, দিয়ার ভিতর কিসের এতো অহংকার ও সুন্দর এটাই কি ওর অহংকার? 

দিয়া বললো, 

- 'এই তাকিয়ে কি দেখো' 

আমি বললাম, 

- 'না কিছু না' 

খাবার খেতে খেতে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টি আমার অনেক ভালো লাগে ছোট বেলা থেকেই খুব পছন্দ, মনে খুব ইচ্ছে জাগলো দিয়াকে সঙ্গে নিয়ে ভেজার জন্য, কিন্তু দিয়া কি রাজি হবে? ভাবতে ভাবতে খাচ্ছি।

খাওয়া শেষ করে কতটা সময় বসে দিয়ার সাথে গল্প করলাম। বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছেটা আরও বেড়ে গেল। আমি দিয়ার হাত ধরে নিয়ে হোটেলের সামনে এসে বললাম, 

- 'চলো আজ দুজনে বৃষ্টিতে ভিজবো!' 

দিয়া টান দিয়ে ওর হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললো আমার থেকে , 

- 'তুমি কি পাগল হয়ে গেছো নাকি?এতো টাকা খরচ করে মেকাপ করে এসেছি বৃষ্টিতে ভেজার জন্য , যতসব উদ্ভোট কথাবার্তা বলো তুমি সিয়াম এগুলো আমার একদম ভালো লাগে না ।

কি হয়েছে হঠাৎ তেমার এটা কোন শখ  হলো তোমার ?'

দিয়ার কথায় আমি খুব কষ্ট পেলাম   তবুও নিজেকে শান্ত করে মানিয়ে রাখলাম দিয়াকে যে ভালোবাসি, তখন দিয়া বলে উঠলো

তোমাকে তোমার এসব ন্যাকামি পরিবর্তন করতে হবে, যদি না কর তাহলে তোমার বিষয়ে আমার নতুন করে ভাবতে হবে। ' 

বলে সে একটা সি এন জি ডাক দিয়ে উঠে গেলো, আমি ডাক দিলাম কিন্তু আমার আর কোন কথাই দিয়া শোনলো না, মেজাজটা তখন প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেল। এতো কিসের ইগো দিয়ার। তারপরেও নিজেকে সামলে নিলাম হয়তো ভালোবাসি বলে।

মন খারাপ হয়ে গেল, তাই আর বাহিরে থাকতে ইচ্ছে করছে না এদিকে বৃষ্টি থামার কোন নাম নাই। তাই বাধ্য হয়ে আমিও একটা সি, এন, জি নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাসায় এসে কলিং বেল দিলে মা এসে দরজা খুলল,  আমি আমার রুমে গিয়ে দেখি নিহা,  আমি মনে মনে একটু খুশি হলাম ভাবলাম ভালোই হয়েছে, তখন নিজেকে একটু রিল্যাক্স ফিল করার জন্য বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে  বাহিরে তাকিয়ে ছিলাম। 

একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বাহিরের বৃষ্টি দেখছি।

সিগারেট শেষ করে রুমে ঢুকে খাটে বসতেই নীরা দরজা খুলে ঘরে ঢুকলো। ওকে দেখে আমার প্রচন্ড রাগ হবার কথা, কিন্তু ওর দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম পুরো শরীর ভেজা। কেমন করে যেন রাগটা কমে গেল। ও লাজুক ভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, শরীর থেকে টপটপ করে পানি বেয়ে পড়ছে বৃষ্টিতে এতো সময় ভিজেছে তা আমার বুঝতে বাকি রইলো না। 

আমি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম, ও দৌড়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল। ওর শাড়ি বেয়ে পুরো ঘরে পানি পরছে। আমি চুপ করে বিছানায় শুয়ে পরলাম, অল্প সময়ের ভিতরে নীরা শাড়ি চেঞ্জ করে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হলো। নীল রঙের একটা শাড়ি পড়েছে নীরা, নীল আমার সব চেয়ে পছন্দের রঙ, হবার কারণে চোখ আটকে গেল নীরার দিকে, অপূর্ব সুন্দর লাগছে নীরাকে।  আয়নার সামনে যেয়ে চোখে কাজল দিচ্ছে, আয়নায় নীরার প্রতিবিম্ব ভেসে আসছে, সাধারণ সাজে অপলক সুন্দর লাগছে নীরাকে।

নীরা সাজগুজ  শেষ করে আমার দিকে তাকাতেই, আমি নিজেকে তার থেকে আড়াল করতে চাইলাম কিন্তু আমি জানি আমি তা পারিনি। নীরা আমার পাশে এসে বললো। 

- 'আজ এতো তাড়াতাড়ি চলে আসলেন বাসায়'

আমি বললাম, 

- 'এমনিতেই! দরকার না থাকলে আমার সাথে কোন কথা বলার প্রয়োজন নাই।'

নীরার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল, এবং সে মাথা নিচু করে বললো, 

- 'আচ্ছা আমাকে কেমন লাগছে আজ' 

আমি ওর দিকে না তাকিয়ে বললাম, 

- 'যেমন ছিলে তেমনি' 

নীরা আর কথা না বলে চলে গেল ঘর থেকে বাহির হয়ে। আমি ম্যাসেঞ্জার অন করে দিয়াকে নক দিলাম, বললাম, 

- 'রাগ করছো?' 

দিয়া রিপ্লাই করলো, 

- 'রাগ করবো না তো কি করবো? তুমি বাংলাদেশে এসে কেমন হয়ে গেছো একবারও কি তুমি ভেবে দেখেছো?কি সব গ্রামের মেয়েদের মত তুমি আমাকে থাকতে বলছো, জানো আমার কতটা কষ্ট লেগেছে'

আমি বললাম, 

- 'দেখো আমি মোটেও এভাবে বলতে চাইনি, আসলে সব সময় এগুলা ব্যবহার  করলেতো স্কিন নষ্ট হয়ে যাবে।' 

দিয়া রাগের ইমুজি দিয়ে লেখলো, 

- দেখো সিয়াম, এই বয়সে যদি একটু ফ্যাশন না করি, ত্বকের যত্ন না করি, তবে কি বুড়ি হয়ে করবো।

আমি বললাম, 

- 'আচ্ছা ঠিক আছে তোমার যেমন খুশি তেমন করে সেজো'

দিয়া আমাকে বললো, 

- 'দেখ আমার মর্ডান ছেলে ছাড়া পছন্দ না, তুমি বিদেশে ছিলে তখন এক রকম ছিলে কিন্তু দেশে এসে তোমার পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমি তোমাকে ঐ রকমই দেখতে চাই আমার সাথে ক্ষ্যাত টাইপ কথাবার্তা কখনোই বলবা না আর তুমি , তাহলে হয়তো আমাদের রিলেশনটা আর কন্টিনিউ করা সম্ভব হবে না আমার।'

দিয়ার কথায় আমি প্রচন্ড আঘাত পেলাম এগুলা কি বলছে দিয়া আজ প্রায় চার মাস ধরে ওর সাথে সম্পর্ক, হঠাৎ করেই এতোটা পরিবর্তন কেন আমার কিছুই বুঝে আসছে না? আমি তারপরেরও নিজেকে সংযত করে নিলাম।

এমনিতেই সংসারের অশান্তিতে আছি, তার উপর যদি দিয়ার সাথেও ঝামেলা করি তবে মনটা আরও খারাপ হয়ে যাবে। তাই ওকে বললাম, 

- 'আচ্ছা ঠিক আছে আগে আমি যেমন ছিলাম তেমনি থাকবো' 

দিয়া একটা হাসির ইমুজি দিলো।

এর মাঝেই নীরা নাস্তা নিয়ে ঢুকলো, আমি খেয়াল করে দেখলাম, আমার প্রিয় লুচি আর আলুর দম নিয়ে এসেছে, আমার অসম্ভব প্রিয় একটা খাবার, এই বৃষ্টির দিনে এমন নাস্তা মানেই জিভে জল চলে আসা। নীরা নাস্তা গুলো এগিয়ে দিলো, আমি কোন কথা না বলে খেতে শুরু করলাম। খাবারের টেষ্ট আজ অন্য রকম লাগছে, মায়ের হাতের লুচি আর আলুরদম অনেক প্রিয় আমার। তাই আমি তার হাতে বানানো লুচির স্বাদ বলতে পারবো না। 

আমি নীরাকে প্রশ্ন করলাম, 

- 'লুচি কি তুমি বানিয়েছো?'

নীরা মাথা নেড়ে বললো, 

- 'হ্যাঁ আমি বানিয়েছি।' 

আমি বললাম, 

- 'খুব ভাল হয়েছে' 

নীরা একটা লাজুক হাসি দিলো, আমি বললাম, 

- 'এটা আমার খুবি প্রিয় একটা খাবার'

নীরা মাথা নেড়ে বললো,

- 'জানি'  

- 'কে বলেছে?' 

- 'আপনার ভাইয়ের জন্য যখন বানাতাম তখন সে খেতে খেতে বলতো, আপনার খুব পছন্দের খাবার লুচি, এর জন্য নাকি ছোট বেলায় দুই ভাই অনেক ঝগড়াও করতেন। সেই মানুষটা আপনাকে অসম্ভব ভালোবাসতো'

 কথা গুলো বলতে বলতে দেখলাম নীরার চোখে  পানি চলে এসেছে, নীরা দৌড়ে চলে গেলো বারান্দায়।

পুরনো দিন গুলির কথা মনে পরে গেলো, দুই ভাই কতই না মজা করতাম, দুজনের সব কিছু একই রকম লাগতো। জামা কাপড় খাবার সব কিছুই দুই ভাইয়ের একই রকম থাকতো ছোট বেলা থেকে। নীরার মন খারাপ হয়ে গেছে হয়তো ভাইয়ার স্মৃতি মনে পড়াতে। ভাবতে ভাবতে কেন জানি বারান্দায় নীরার পাশে যেয়ে দাঁড়াতে খুব ইচ্ছে করলো খাট থেকে আমিও যেয়ে দাঁড়ালাম বারান্দায় নীরার দিকে, নীরার চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে, কেন জানি প্রচন্ড রাগ হচ্ছিলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছে ন্যাকা কান্নাকাটি করছে নীরা, কিছু বলতে যাবো এমন সময় নীরা বলে উঠলো,

- “আসলে আমার জন্যই আপনার জীবনটা আজ এমন হয়ে গেছে।  😪
 কিন্তু আমি চাইনা আপনার জীবনটা এমন হোক, আমি স চাই আপনি সুখের সংসার করেন। আমি আপনার জীবনে কখনোই বাঁধা হয়ে আসবো না আমি।

সবারই জীবনে স্বপ্ন থাকে, আমারও ছিল। সুন্দর সুখের একটা সংসার হবে, স্বামীর ভালোবাসা থাকবে সেখানে, একটা ছোট বাচ্চা হবে, পুরো বাড়ি হাসি খুশি আর দুষ্টমিতে মাতিয়ে তুলবে। দিন শেষে স্বামী ক্লান্ত শরীরে আসবে, আমি তার জন্য এক গ্লাস শরবত বানিয়ে নিয়ে যেয়ে, শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে দিতে দিতে বলবো, ‘খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমায়, শরবতটা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নাও।’ সে আমায় জড়িয়ে ধরে বলবে, ‘তোমাকে দেখার পর সব ক্লান্তি চলে গিয়েছে, চলো তোমাকে কাজে সাহায্য করি।’ সব কিছু ঠিক মতই চলছিল, খুব ভালোবাসতো আমাকে আপনার ভাই, কিন্তু আল্লাহ হয়তো সে সুখ আমার কপালে রাখেনি।

কিন্তু আমি চাইনা আমার জন্য আপনার স্বপ্ন গুলো হারিয়ে যাক, আমি চাই আপনার জীবনটা সুন্দর গোছানো হোক, আপনার স্বপ্ন গুলো সত্যি হোক। আমি চাই আপনি পরিপূর্ণ হোন জীবনে।”

কথা গুলো বলছে আর মুক্তর দানার মত চোখের পানি বেয়ে পড়ছে নীরা চোখ থেকে। আমি আর কিছু না বলে সিগারেট শেষ করে চলে আসলাম রুমের ভিতর। বিছানায় শুয়ে পড়লাম, নীরা তখনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান্না করেই চলেছে, আমার কাছে ভালো লাগছে না কোন কিছুই, খারাপ লাগছে নীরার জন্যও, ওরতো কোন দোষ নেই। না আমি কোন কিছু নিয়ে ভাবতে চাই না। আমি কোন মায়ায় পড়তে চাইনা।

মোবাইল হাতে নিয়ে দিয়াকে ম্যাসেজ করলাম, দিয়ার সাথে দীর্ঘ সময় ধরে চ্যাটিং করলাম। কোন কিছুই ভাল লাগছে না, কেমন যেন সব এলোমেলো মনে হচ্ছে। জীবনে এমন একটা মুহূর্ত আসবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। নীরা ঘর থেকে বের হয়ে গেল, বাহিরে তাকিয়ে দেখি তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আমি দুচোখ বন্ধ করে কত সময় শুয়ে ছিলাম মনে নেই, হঠাৎই নীরার ডাকে চোখ মেলে তাকালাম।

চলবে...

17 মন্তব্যসমূহ

  1. I love how this article dives deep into the details without overwhelming the reader.

    উত্তরমুছুন
  2. Every click on your site feels like entering a space where knowledge meets heartfelt expression

    উত্তরমুছুন
  3. "The loading speed of this website is impressive, even with high-resolution images and videos."

    উত্তরমুছুন
  4. Found exactly what I was looking for in no time. The search function is on point.

    উত্তরমুছুন
  5. "The user interface is so intuitive that even new users can navigate effortlessly. It's user-friendliness at its best."

    উত্তরমুছুন
  6. A well-crafted piece that manages to be both entertaining and informative.

    উত্তরমুছুন
  7. Incredibly insightful article, seamlessly blending depth of analysis with clarity of expression – a captivating read!

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন