≈ গল্পঃ মাইশা মৃত্যু ≈
প্রতিদিনের মতো আজ ও অফিস থেকে ফেরার পথে দুইটা তাজা গোলাপ নিয়ে বাসায় গিয়ে অনেক বার কলিংবেল চেপে ও দেখি মাইশা দরজা খোলে দিচ্ছে না।
সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত শরীরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পারছি না । কিছুক্ষণ পর পর ডাকাডাকি শুরু করলাম। এদিকে মাইশার ফোনে আমি অনেক বার কল দিলাম কিন্তু কেও রিসিভ করে না। মাইশার ফোনের রিংটনের আওয়াজ আমি শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু মাইশা তো এমন কখনোই করে না। এই সন্ধ্যায় তো কখনো ঘুমায় না। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম।
আমার বাসা নিচতলায় তাই ঘুরে বেলকুনির সামনে গিয়ে দেখি দরজা অর্ধেক খোলা রয়েছে কিন্তু মাইশাকে দেখা যায় কি না তাই আমি দরজার ফাঁকদিয়ে তাকাতাকি করছিলাম আমি । কিছুক্ষণ তাকাতাকি করার পর হঠাৎ ফ্লোরে দিকে চোখ আটকে যায় আমার। মাইশার চুল এলোমেলো অবস্থায় ফ্লোরে বিছিয়ে থাকতে দেখলাম।
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ ধাক্কাদিয়ে উঠলো। আমি এবার উত্তেজিত হয়ে ঘরের ভেতরে দেখার জন্য বেলকুনির গ্রিল বেয়ে কিছুদূর উঠে উকিদিলাম। তাকাতেই দেখি মাইশা হাতপা ছুঁড়ে অর্ধনগ্ন অবস্থায় ফ্লোরে পড়ে আছে। ওর পায়জামা অর্ধেক খোলা।
দেখামাত্রই আমার দেহ পাথরের মত শক্ত হয়ে গেলো। আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। সোজা নিচে আছড়ে পড়লাম গ্রিল থেকে।
তখন সন্ধ্যা ৭.৩০ এর কাছাকাছি।
আমার গলা শুকিয়ে গেলো। আমার হাত-পা থরথর করে কাপাছে। আমি কি দেখলাম এটা আমি যেনো নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারতেছি না ? কোন রকমে দাঁড় করিয়ে বাসার দরজার সামনে গিয়ে পাশের বাসার কাদের ভাইকে ডাক দিলাম। আমি যেন কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছি। নিজের ভেতর কোনকিছু যেন অনুভূত হচ্ছে না।
.
পাঁচ বছর রিলেশন করে বিয়ে আমাদের। বিয়ে হয়েছে এই দুই বছর। খুব ভালোবাসি মাইশা কে। ওকে ছাড়া আমি এক মুহুর্ত নিজেকে কল্পনা করতে পারি না।আমার ডাকাডাকি শুনে কাদের ভাই তাড়াতাড়ি দরজা খুললেন।আমি উনাকে যে বিষয়টা বলবো কিন্তু গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছিলো না।শুধু এতটুকুই বলতে পারলাম,
– “ ভাই দরজা ভাঙতে হবে। ”
কাদের ভাই আতঙ্কের স্বরে বললেন,
– “ কেন স্বপ্নীল ভাই কি হয়েছে? ”
আমি কান্না মাখা কণ্ঠে,
– “ আমার মাইশা.. ভাই.. আমার মাইশা ফ্লোরে পড়ে আছে। ”
কাদের ভাই চোখ বড়বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
– “ বলেন কি ভাই? কি হইছে ভাবীর? ”
এই বলে কাদের ভাই উনার সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজায় লাথি মারলেন। আমি ও উনার সাথে তাল মিলিয়ে লাথি দিতেই দরজার ছিটকিনি ছাড়িয়ে দরজা খুলে গেলো ।
দরজা খুলতে যে দেরী আমি মুহুর্তেই বেডরুমে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালাম। অনুভূতিহীন একটা জড় পদার্থের মতো দাঁড়িয়ে আছি আমি। সাথেসাথেই কাদের ভাই ঢুকলো। ফ্লোরে মাইশাকে দেখেই কাদের ভাই চোখ বন্ধকরে অন্যদিক ফিরলেন।
বেডরুমের ফ্লোরে মাইশার শরীর অর্ধনগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেউ রে*প করে গলাটিপে হত্যা করেছে ।
– ” আমার মাইশা আর পৃথিবীতে নাই... আমার মাইশা...আমার কলিজা.. আমার সব সব কেড়েনিলো..... ”
পাগলের মতো কথাগুলো আমার মুখ দিয়ে বেরহচ্ছিলো। হঠাৎ হঠাৎ হাসি পাচ্ছিলো হেসে উঠছিলাম শব্দ করে ।হাসতে ডুকরে কেঁদেউঠে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম মাইশার উপর।
কাদের ভাই পেছন থেকে বললেন,
– “ শান্ত হন ভাই। এখন হাত দিয়েন না ভাবীর গায়ে । পরে সমস্যা হতে পারে। ”
আমি কোন কথা শুনলাম না। মাইশার মাথাটা আমার বুকে শক্তকরে জড়িয়ে ধরলাম। হাহাকার দিয়ে কেঁদে উঠলাম। আমার যেন দম ফুরিয়ে আসতেছে। ধীরেধীরে চোখে ঝাপসা দেখতে লাগলাম।
.
আমার জ্ঞান ফিরলে তাকিয়ে দেখি সাজানো এখটা ঘরে । অস্পষ্ট কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি আমি । দেখলাম শুয়ে আছি কাদের ভাই এর বেডরুমে। আমি সেখান থেকে কাদের ভাই এর বাসার মেইন দরজা খুলতেই দেখি বহু মানুষের ভীড়। আমি লোকজন ঠেলে ভেতরে যেয়েই দেখি আমার শাশুড়ি মা শব্দকরে কান্না করছেন। পরক্ষণেই একটা ঘুষি এসে লাগলো আমার ডান কাধে। আমি সাথেসাথেই ঘুরে পড়লাম নিচে। তাকিয়ে দেখি আমার শ্যালক মানে মাইশার ছোটভাই তারেক আমার জামার কলার ধরে টেনে তুলছে আর বলছে,
– “ আমার আপুরে তুই কেন মেরেছিস। কেন মেরেছিস বল কেন.. ”
চিৎকার দিয়ে উঠলো তারেক। আমি শুধু অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি ওর দিকে। দুইটা পুলিশ কনস্টেবল ছুটে এসে তারেক কে আটকালো। তারেক ক্ষিপ্ত বাঘের মতো আমার দিকে রুখে আসতেছে। দুই কনস্টেবল যেন ওকে ধরে রাখতে পারছে না। একজন এগিয়ে এসে আমাকে টেনে তুললো। তাকিয়ে দেখি নাঈমা। জান্নাতুন নাঈমা হচ্ছে মাইশার ছোট বোন। ওরা তিন ভাই-বোন। মাইশা সবার বড় তারপর তারেক আর সবার ছোট নাঈমা। নাঈমা এবার ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।
নাঈমা আমাকে উঠাতে উঠাতে বলছে,
– “ আপনার লেগেছে অনেক দুলাভাই ? ভাইয়া আস্তে আস্তে অমানুষ হয়ে যাচ্ছে। আপনি জানেনই তো ভাইয়া কত রাগী। কোনকিছু না শুনে না বুঝে সিনিয়র মানুষের গা এ... ”
আমি ওর কথা শেষ করতে না দিয়ে বললাম,
– “ না না সমস্যা নাই ঠিক আছে আমি কিছু মনে করিনি। ”
এই বলে আমি আমার রুমে গেলাম। গিয়ে দেখি পুলিশ মাইশাকে উঠাচ্ছে। হয়তো লাশ পোস্টমর্টেম করতে নিয়ে যাবে ।
এস. আই. আমাকে দেখে বললো,
– “ আপনি এই রুমে কি করেন? বলেছি না কাউকে এখানে না আসতে। ”
আমি ক্ষীণ গলায় উত্তর দিলাম,
– “ আমি ওর স্বামী। ”
অফিসার চোখ বড়বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
– “ আপনি উনার স্বামী? এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? ”
– “ আমার ওয়াইফের এই অবস্থা দেখে আমি সেন্সলেস হয়ে যাই। ”
– “ আপনাকেই তো দরকার আমাদের। আপনি আসছেন ভালো হয়েছে। কিছু প্রশ্নের জবাব দিন আমাদের। ”
– “ বলুন। ”
– “ কাদের নামের এক ভদ্রলোক আমাদের কাছে বললেন আপনি উনাকে দরজা ভাঙার জন্য বলেছিলেন? ”
– “ হ্যাঁ। ”
– “ তা দরজা ভাঙলেন কেন? ”
– “ ভেতরে আটকানো ছিলো তাই। ”
অফিসার কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার প্রাশ্ন করলেন,
– “ আপনার ওয়াইফের লাশের অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে তাকে রে*প করে শ্বাস রোধ করে মারা হয়েছে । গলার দুই পাশে স্পষ্ট হাতের দাগ রয়েছে।দরজা যদি ভেতর দিয়ে লাগানো থাকে তাহলে তাকে রে'প করলো কে ? আর মারলোই বা কে ? এই বাসা থেকে তো বের হবার আর কোন পথ নাই। তাহলে? ”
– “ আমি সেটা কিভাবে বলবো? আমি অফিস থেকে এসে দেখি দরজা লাগানো তাই আমি বেলকুনির পাশ দিয়ে দেখতে পাই মাইশা আই মিন আমার ওয়াইফের চুল এলোমেলো হয়ে ফ্লোরে পড়ে আছে। তারপর আমি ছুটে গিয়ে কাদের ভাইকে ডাকে আনি । উনি আর আমি দরজা ভাঙি। ”
– “ হুম... কাদের ভাই ও আমাদের তাই বললেন। ”
এই বলে অফিসার একপাশের গ্রিল হাত দিয়ে একটু আঘাত দিয়ে দেখলেন । এরপর এসে আমাকে বললেন,
– “ আপনাকে আবার ডাকা হতে পারে কিছু ইনফরমেশনের জন্য । ”
এই বলে আমার মাইশা কে ওরা নিয়ে গাড়িতে তুললো। মাইশাকে নিয়ে যাওয়ার সময় প্রাই ঝাপিয়ে পড়লেন মাইশার উপর আমার শাশুড়ি মা। নাঈমা উনাকে টেনে নিয়ে ওর বুকে নিয়ে নিলো।
আমার বুকের ভেতরের হাহাকার করতে লাগলো... লাগলো। চোখের সীমানা আর ধরে রাখতে পারলো না জল গুলো।কিন্তু একটা চিন্তা আমাকে আটকে দিলো। দরজা তো সত্যিই ভেতর থেকে আটকানো তাহলে এসব করলো কে? কাদের ভাইকে ডাক দিলাম। উনি বললেন সমস্ত ঘর তখনই খুঁজেছিলাম। কেউ লুকিয়ে আছে কি না। বাট কেউ ছিলো না।আর আপনি তো এদিকে সেন্সলেস।আমার মাথা ঘুরে আসছে। কিভাবে সম্ভব? কেউ তো এটা করেছে? সে কি জ্বীন যে হাওয়া হয়ে যাবে?বাসার সব প্লেস তন্নতন্ন করে খুঁজাও কোথাও কারো নিশানা পেলাম না।
.
মাইশার লাস দাফন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনো কোন উত্তর মিললো না কে ? কিভাবে ? কেন? ঘরে ঢুকলো কে আর কেনই বা মেরে রেখে গেলো এভাবে ? অপরাধী যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। আমার পৃথিবী কেঁড়ে নিলো যে তাকে তো আমি ছেড়ে কথা বলবো না।একদিকে মাইশাকে হারানোর যন্ত্রণা আর অন্যদিকে রহস্যের জালে ঘিরে আমি। আমি কোন আগা মাথা খুঁজে পাচ্ছি না কিভাবে কোথাথেকে শুরু করবো।
.
.
রাত ৩.৪৫ মিনিট,
চেয়ার নিয়ে আমি বেলকুনিতে বসে আছি। আমার চোখে কোন ঘুম নাই। মাইশা যাওয়ার পর এই তিন দিন আমি একটুও ঘুমাতে পারি না। মাঝরাতে শুনতে পাই যেন মাইশা কাঁদোকাঁদো গলায় আমাকে বলছে, ‘ ওকে ছেড়ো না স্বপ্নীল। ’
সাথেসাথেই আমি এদিকে ওদিকে তাকাতাকি করি কিন্তু কাউকে দেখতে পাই না। পরক্ষণেই বুঝি হ্যালোসিনেশন হবে হয়তো এটা।
আজ পূর্ণিমা রাত। চাঁদটা যেন আমার মাইশার জন্য আরো উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠলাম মাইশা থাকলে হয়তো এখন আমাজে বলতো,‘ এই জান এদিকে আসো। দেখো কতো সুন্দর চাঁদ। ’
আমি তখন ওই চাঁদের চেয়ে আরো উজ্জ্বল আমার মাইশার চাঁদ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেলকুনির গ্রিল ধরে চাঁদটা দেখতে যাবো ঠিক এমন সময় গ্রিলের জয়েনিং এর একপাশ একটু আলগা হয়ে গেলো।আমিতো অবাক হয়ে গেলাম ।আবার একটা ধাক্কা দিতেই দেখি গ্রিলের একপাশ বাইরে সরে গেলো গ্রিলটা ।আমার গলা শুকিয়ে হাত ডুইটা কাঁপতে লাগলো ।পুলিশ তো ধাক্কাদিয়ে দেখলো তখন কিছু হলো না।এখন কেন হলো এমন?...
(চলবে)
--------------------------------



The site has become my digital companion.
উত্তরমুছুনLove the user-friendly layout.
উত্তরমুছুন"The email subscription on this website is a great way to stay updated with the latest news and offers."
উত্তরমুছুনA fantastic blend of creativity and functionality – love it
উত্তরমুছুন